বাংলাস্ফিয়ার: মহারাষ্ট্র সরকারের বহুল আলোচিত ‘মুখ্যমন্ত্রী মাঝি লাডকি বহিন যোজনা’-য় ব্যাপক যাচাই অভিযানের পর ৯২ লক্ষেরও বেশি উপভোক্তার নাম বাদ পড়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, এই ছাঁটাইয়ের ফলে প্রকল্পের আওতাভুক্ত উপভোক্তার সংখ্যা প্রায় ২.৪৩ কোটি থেকে কমে প্রায় ১.৫ কোটি হয়েছে। অর্থাৎ, প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত প্রতি ১০ জন মহিলার মধ্যে প্রায় ৪ জনই আর ভাতা পাবেন না।

এই প্রকল্পটি মহারাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ নগদ সহায়তা কর্মসূচি। যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা করে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে চালু হওয়া এই প্রকল্পকে মহাযুতি জোটের রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি বলে মনে করা হয়। কিন্তু প্রকল্প চালুর পর থেকেই ভুয়ো আবেদন, একাধিক নিবন্ধন এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। সেই কারণেই সরকার রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত যাচাই অভিযান শুরু করে।

সরকারি নথি অনুযায়ী, বাদ পড়া উপভোক্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ—প্রায় ৬২ লক্ষ—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাধ্যতামূলক ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ করেননি। মোট বাদ পড়াদের প্রায় ৬৭ শতাংশই এই কারণে তালিকা থেকে বাদ যান। এছাড়া প্রায় ১৬ লক্ষ আবেদনকারীর পরিবারের বার্ষিক আয় প্রকল্পের নির্ধারিত ২.৫ লক্ষ টাকার সীমার বেশি হওয়ায় তাঁদেরও অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

এছাড়াও যাচাইয়ে ধরা পড়েছে, কয়েক লক্ষ উপভোক্তা বা তাঁদের পরিবারের সদস্য সরকারি কর্মচারী। আবার অনেকেই অন্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধাও পাচ্ছিলেন, যা এই প্রকল্পের নিয়মের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। এই ধরনের দ্বৈত সুবিধাভোগীদেরও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার ফলে সরকারের আর্থিক বোঝাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। চলতি অর্থবর্ষে প্রকল্পের বরাদ্দ প্রায় ৯,৫০০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি। এর মাধ্যমে প্রকল্পকে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই রাখাই সরকারের লক্ষ্য।

তবে বিরোধীরা সরকারের এই পদক্ষেপকে কড়া সমালোচনার মুখে ফেলেছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত উপভোক্তারাও প্রশাসনিক ত্রুটি, প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। অনেক গ্রামীণ মহিলা ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের একাংশও আর্থিক সহায়তা হারিয়েছেন বলে বিরোধীদের দাবি।

সরকার অবশ্য বলছে, প্রকল্প বাতিল করা হচ্ছে না; বরং প্রকৃত যোগ্যদের কাছেই সরকারি অর্থ পৌঁছে দেওয়াই এই অভিযানের উদ্দেশ্য। সরকারের বক্তব্য, একাধিকবার সময়সীমা বাড়িয়েও বহু আবেদনকারী প্রয়োজনীয় নথি বা ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ করেননি। তাই চূড়ান্ত যাচাইয়ের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটির গুরুত্ব শুধু সামাজিক নয়, রাজনৈতিকও। মহারাষ্ট্রে নারীদের জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা কর্মসূচি হিসেবে ‘লাডকি বহিন’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ফলে এত বড় সংখ্যায় উপভোক্তা বাদ পড়ার ঘটনা আগামী দিনে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র করতে পারে। বিরোধীরা ইতিমধ্যেই দাবি তুলেছে, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং যাঁরা প্রযুক্তিগত কারণে বাদ পড়েছেন, তাঁদের জন্য নতুন করে আবেদন বা যাচাইয়ের সুযোগ দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ঘটনা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চালু নগদ সহায়তা প্রকল্পগুলির সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে—বৃহৎ জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে কীভাবে প্রকৃত উপভোক্তাকে চিহ্নিত করা হবে এবং একই সঙ্গে প্রকৃত সুবিধাভোগী যেন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বঞ্চিত না হন, তার ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে।

মহারাষ্ট্র সরকারের দাবি, এই যাচাই অভিযানের ফলে প্রকল্পে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সরকারি অর্থের অপচয় কমবে। তবে বাস্তবে কতজন প্রকৃত উপভোক্তা পুনরায় তালিকাভুক্ত হতে পারবেন এবং কতজন স্থায়ীভাবে বাদ পড়বেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।