হাইলাইটস:
- ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার যুগ্ম ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে ১,৪৫০, আহত ৩,১৫০।
- ১২,৭২১ মানুষ গৃহহীন; ৭৭৪টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত, তার মধ্যে ১৮৯টি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
- ৭২ ঘণ্টার গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধার-সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা দ্রুত কমছে।
- ৪৩০টিরও বেশি আফটারশকে আতঙ্কিত মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন।
- যানজটে আটকে পড়ছে উদ্ধারকারী দল; সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ত্রাণ উদ্যোগই অনেক ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
- রাষ্ট্রসংঘের আশঙ্কা, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
- এই বিপর্যয় প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের প্রশাসনের সক্ষমতার বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে; একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ভেনেজুয়েলা সম্পর্কও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে।
উত্তর ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের চার দিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের জন্য মরিয়া অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, ততই নিভে আসছে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টাই জীবিত উদ্ধার করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেই ‘সোনালি সময়’ ইতিমধ্যেই অতিক্রান্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
বুধবার ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প উত্তর ভেনেজুয়েলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। বিশেষ করে উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অসংখ্য বাড়ি, বহুতল, সরকারি দপ্তর ও বাণিজ্যিক ভবন মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে মিশে যায়। হাজার হাজার পরিবার এক নিমেষে গৃহহীন হয়ে পড়ে। রবিবার ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের নেতা হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৪৫০। আহত হয়েছেন অন্তত ৩,১৫০ জন। নিরাপদ আশ্রয় হারিয়েছেন ১২,৭২১ মানুষ। মোট ৭৭৪টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৯টি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে এবং আরও ৫৮৫টি আংশিক বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা এখন অত্যন্ত সংকটজনক সময়ের মধ্যে রয়েছি। প্রতিটি ঘণ্টা অত্যন্ত মূল্যবান।”
তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির ধারণা, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের তুলনায় আরও বড় হতে পারে। রাষ্ট্রসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোল্লা জানান, তাদের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী অন্তত ১২৫টি বড় ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। এত বিপুল সংখ্যক ভবন ধসে পড়ার অর্থ, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষের দেহ চাপা পড়ে থাকতে পারে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রবল। শিশুদের অবস্থা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ইউনিসেফ জানিয়েছে, প্রায় ১৮ লক্ষ মানুষ এখন জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৬ লক্ষ ৮০ হাজার শিশু রয়েছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ওষুধ, অস্থায়ী আশ্রয় এবং স্বাস্থ্যসেবার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে একের পর এক আফটারশক। বুধবারের পর থেকে রবিবার পর্যন্ত ৪৩০টিরও বেশি ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। প্রতিবার মাটি কেঁপে উঠলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। বহু মানুষ নিজেদের বাড়িতে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। তাঁরা খোলা মাঠ, পার্ক কিংবা রাস্তার ধারে রাত কাটাচ্ছেন, কারণ যেকোনও মুহূর্তে দুর্বল ভবন ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে উদ্ধার অভিযানের রসদ পৌঁছে দেওয়া নিয়ে। লা গুয়াইরায় প্রবেশের একমাত্র প্রধান সড়কটি হাজার হাজার ব্যক্তিগত গাড়িতে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে খাদ্য, জল, ওষুধ ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবকও দুর্গতদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন।
কিন্তু এই মানবিক উদ্যোগই উল্টো উদ্ধারকাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। যানজটের কারণে সরকারি উদ্ধারকারী দল, অ্যাম্বুল্যান্স, ভারী যন্ত্রপাতি এবং চিকিৎসা-সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে বহু জায়গায় উদ্ধার অভিযান বিলম্বিত হচ্ছে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লা গুয়াইরায় সাধারণ যানবাহনের প্রবেশ সীমিত করার চেষ্টা করেছে। কেবল সরকারি যান, উদ্ধারকারী দল এবং অনুমোদিত সংস্থাগুলিকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বহু নাগরিক সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজ উদ্যোগেই ত্রাণ নিয়ে দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকারীরা এখনও নিরলসভাবে কাজ করছেন। কোথাও আধুনিক যন্ত্রপাতি, কোথাও আবার কেবল কোদাল কিংবা খালি হাতেই ভাঙা কংক্রিট সরানো হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা বারবার ধ্বংসস্তূপের দিকে চিৎকার করে সম্ভাব্য জীবিতদের সাড়া পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফিরে আসছে কেবল নীরবতা। এই বিপর্যয় শুধু মানবিক সংকটই নয়, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের প্রশাসনের সামনে এটি সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলির একটি। ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণের দক্ষতার উপরই সরকারের প্রতি জনআস্থা অনেকটাই নির্ভর করবে।
একই সঙ্গে এই দুর্যোগ যুক্তরাষ্ট্র–ভেনেজুয়েলা সম্পর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় দীর্ঘদিনের শাসক নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে নতুন প্রশাসন গঠিত হয়। সেই পরিবর্তনের পেছনে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ফলে এই বিপর্যয়ে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া এবং সহায়তার ধরনও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এখন ভেনেজুয়েলার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও কত মানুষ জীবিত রয়েছেন, আর কত পরিবার তাদের প্রিয়জনের অপেক্ষায় অনিশ্চয়তার প্রহর গুনছে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ঘণ্টা যেন আশা ও হতাশার সীমারেখাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।