Home খবর বাপেরা করছে চুক্তি, ছেলেরা লুটবে মুনাফা

বাপেরা করছে চুক্তি, ছেলেরা লুটবে মুনাফা

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
24 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • কাজাখস্তানের বিশাল টাংস্টেন খনি প্রকল্পে মার্কিন সরকারের সম্ভাব্য ১.৬ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা।
  • চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ সংস্থার বিনিয়োগ।
  • বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিকের পরিবারের সংস্থারও একই প্রকল্পে অর্থ সংগ্রহে ভূমিকা।
  • মোট ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রকল্পে ট্রাম্প ও লাটনিক পরিবারের আর্থিক স্বার্থের অভিযোগ।
  • বিরোধীদের অভিযোগ, জাতীয় নিরাপত্তার নামে সরকারি নীতি ও পারিবারিক ব্যবসার বিপজ্জনক মিশেল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই বিরল ও কৌশলগত খনিজের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। সেই লক্ষ্যেই মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখস্তানের বিশাল টাংস্টেন ভাণ্ডারকে ঘিরে শুরু হয়েছে এক উচ্চাভিলাষী খনি প্রকল্প। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার এই উদ্যোগ এখন বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে। কারণ অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পে শুধু মার্কিন সরকারই নয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিকের পরিবারেরও প্রত্যক্ষ আর্থিক স্বার্থ জড়িয়ে পড়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কের সেন্ট রেজিস হোটেলে হাওয়ার্ড লাটনিক কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের শেষ পর্যায়ে ফোনে যোগ দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও। সেই আলোচনাতেই কাজাখস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব একটি মার্কিন সংস্থাকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অনাবিষ্কৃত টাংস্টেন ভাণ্ডার উন্নয়নের অনুমতি দিতে সম্মত হয়। টাংস্টেন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত ধাতু। ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড, যুদ্ধবিমান, আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, কম্পিউটার চিপ এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে এর ব্যবহার অপরিহার্য। ফলে এই প্রকল্পকে ওয়াশিংটন জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মার্কিন সরকার এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক এবং ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের মাধ্যমে মোট ১.৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের প্রাথমিক অনুমোদন দেয়। প্রকল্পটি পরিচালনা করছে বর্তমানে ‘কাজ রিসোর্সেস’ নামে পরিচিত একটি মার্কিন সংস্থা। কিন্তু বিতর্ক শুরু হয় এরপরই।

অভিযোগ, সরকারি সহায়তার প্রক্রিয়া চলাকালীনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দুই ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং এরিক ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগ সংস্থা ডোমিনারি সিকিউরিটিজ এই প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একটি কর্পোরেট সত্তায় ২০ শতাংশ অংশীদারিত্ব অর্জন করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই বিনিয়োগের খবর তখন প্রকাশ্যে আনা হয়নি। একই সময়ে বাণিজ্যমন্ত্রী লাটনিকের পারিবারিক সংস্থা ক্যান্টর ফিটজজেরাল্ডও প্রকল্পের অন্যতম বিনিয়োগকারীর জন্য ২১০ মিলিয়ন ডলার মূলধন সংগ্রহে সহায়তা করে। এমন অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাধারণত বিনিয়োগ ব্যাংকগুলি মোটা অঙ্কের কমিশন পেয়ে থাকে। ফলে সমালোচকদের প্রশ্ন, সরকারি নীতিনির্ধারণের সঙ্গে ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের সীমারেখা আদৌ রক্ষা করা হয়েছে কি?

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে সময় নির্বাচন নিয়ে। ট্রাম্প পরিবারের বিনিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার মাত্র ছয় দিন পরে, ৬ নভেম্বর, কাজাখস্তানের সঙ্গে ওই ঐতিহাসিক খনি চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। তবে বিষয়টি শুধু একটি প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ নয়।

তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প বা লাটনিক পরিবারের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে এমন অন্তত ১৪টি খনিজ সংস্থা বর্তমানে মার্কিন সরকারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজ করছে। এর মধ্যে বহু সংস্থা ইতিমধ্যেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সরকারি ঋণ, অনুদান বা আর্থিক সহায়তার অনুমোদন পেয়েছে। আবার কয়েকটির আবেদন এখনও বাণিজ্য দপ্তরের বিবেচনাধীন। এই সংস্থাগুলির জন্য ইতিমধ্যে অনুমোদিত বা বিবেচনাধীন সরকারি সহায়তার মোট পরিমাণ ৮.৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

এই তালিকায় রয়েছে বিরল মৃত্তিকা, অ্যান্টিমনি, লিথিয়াম, নিকেল এবং অন্যান্য কৌশলগত খনিজ উত্তোলনকারী একাধিক প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চীনের মোকাবিলায় এই প্রকল্পগুলিকে মার্কিন প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। হোয়াইট হাউস অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তই মার্কিন জনগণের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, সমালোচকেরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিষয়টিকে বিকৃতভাবে তুলে ধরছেন। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলকে দেশে ফিরিয়ে আনতেই প্রশাসন এই পদক্ষেপগুলি নিয়েছে। বাণিজ্য দপ্তরও একই অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, প্রকল্পগুলির মূল্যায়ন সম্পূর্ণ পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হয়েছে।

তবে বিরোধী শিবির এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্য ম্যাক্সিন ডেক্সটার বলেছেন, কংগ্রেসের দায়িত্ব হল নিশ্চিত করা যে করদাতাদের অর্থ কোনও সরকারি কর্তাব্যক্তির পরিবারের আর্থিক স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যবহার না হয়। তাঁর মতে, এই ধরনের লেনদেন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সরকারি নৈতিকতার মৌলিক নীতিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসনে ব্যক্তিগত ব্যবসা ও সরকারি নীতির এই ঘনিষ্ঠ সংযোগ নতুন নয়। এর আগে ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতেও ট্রাম্প ও লাটনিক পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এখন সেই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে কৌশলগত খনিজ খাতে। এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ভূরাজনীতি। বর্তমানে চীন বিশ্বজুড়ে বিরল খনিজের বাজারে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সেই নির্ভরতা ভাঙতে মরিয়া। ফলে সরকার এই প্রকল্পগুলিকে কেবল বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে। কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য, যদি একই সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের পরিবারের ব্যক্তিগত লাভের সম্ভাবনাও তৈরি হয়, তাহলে সেই নীতির নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।

কাজাখস্তান প্রকল্পের অন্যতম উদ্যোক্তা অস্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহণকারী রাব্বি পিনি অলথাউস বহু বছর ধরেই কৌশলগত খনিজ ব্যবসায় সক্রিয়। তাঁর নেতৃত্বাধীন উদ্যোগই এখন মার্কিন সরকারের সহায়তায় এই বৃহৎ টাংস্টেন প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু একটি খনি প্রকল্পের নয়। প্রশ্ন হল—জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে গৃহীত সরকারি সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতাসীন পরিবারের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের মধ্যে সীমারেখা কোথায় টানা হবে? আগামী দিনে কংগ্রেস, তদন্তকারী সংস্থা এবং মার্কিন জনমতের সামনে এটাই হয়ে উঠতে পারে অন্যতম বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক বিতর্ক।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles