বিশ্বকাপ বেসরকারিকরণ পরিকল্পনায় ফিফা বয়কটের হুঁশিয়ারি উয়েফার

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: ফিফা যদি বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক মালিকানার একটি অংশ মার্কিনভিত্তিক বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তাহলে ফিফার অধীনে আয়োজিত সব প্রতিযোগিতা বয়কট করবে…
- বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত উয়েফার জরুরি বৈঠকে ৫৫টি সদস্য দেশের ফুটবল সংস্থা সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেয়।
- প্রায় দু’ঘণ্টার বৈঠক শেষে উয়েফা এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ফিফার এই প্রস্তাবকে “সর্বসম্মত ও দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান” করেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: ফিফা যদি বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক মালিকানার একটি অংশ মার্কিনভিত্তিক বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তাহলে ফিফার অধীনে আয়োজিত সব প্রতিযোগিতা বয়কট করবে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত উয়েফার জরুরি বৈঠকে ৫৫টি সদস্য দেশের ফুটবল সংস্থা সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রায় দু’ঘণ্টার বৈঠক শেষে উয়েফা এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ফিফার এই প্রস্তাবকে “সর্বসম্মত ও দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান” করেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতে ফিফার শাসনব্যবস্থা বা প্রতিযোগিতার মালিকানা কখনও বেসরকারি হাতে না দেওয়ার বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত কোনও উয়েফাভুক্ত দেশ ফিফার কোনও প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না।
খুব শিগগিরই উয়েফা ফিফাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেবে যে, বিশ্বকাপ বিক্রির পরিকল্পনা প্রত্যাহার না হলে তারা ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ-সহ সব ফিফা প্রতিযোগিতা বয়কট করবে।
এই সিদ্ধান্ত ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সদস্য দেশগুলিকে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই পরিকল্পনার পক্ষে মত জানাতে বলা হয়েছিল। কিন্তু উয়েফার এই কঠোর অবস্থানের ফলে পরিকল্পনাটি সংশোধন বা সম্পূর্ণ বাতিল করার চাপ অনেকটাই বেড়ে গেল।
বিবৃতিতে উয়েফা বলেছে, “আজকের আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়েছে, এই প্রস্তাব বহাল থাকলে কোনও উয়েফা জাতীয় দল ফিফার কোনও প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। কেবল তখনই আমরা ফিরব, যখন প্রস্তাবটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল হবে এবং ভবিষ্যতে কখনও ফিফার প্রতিযোগিতা বা প্রশাসন বেসরকারি মালিকানার আওতায় আনা হবে না—এমন বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।”
জরুরি বৈঠকের সূচনা করেন উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিন। উয়েফার নির্বাহী কমিটি ও ফিফা কাউন্সিলে থাকা উয়েফার প্রতিনিধিরাও বক্তব্য রাখেন। পরে প্রায় ২০টি সদস্য দেশের ফুটবল সংস্থার প্রধান নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্রের দাবি, পুরো বৈঠকজুড়ে ছিল “ঐক্যের পরিবেশ”।
ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) সভাপতি ডেবি হিউইটও বয়কটের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন। পরে এফএ-র এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা আমাদের ইউরোপীয় সহকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আছি। ফিফার এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছি। ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্পদ, এবং সেটি চিরকাল ফুটবলেরই থাকবে।”
উয়েফার পরিকল্পনা অনুযায়ী, বয়কট শুরু হবে আগামী বছরের মহিলা বিশ্বকাপ থেকে। বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতার মধ্যে প্রথম বয়কটের মুখে পড়তে পারে অনূর্ধ্ব-২০ মহিলা বিশ্বকাপ, যা আগামী ৫ সেপ্টেম্বর থেকে পোল্যান্ডে হওয়ার কথা। সেখানে ২৪টি দলের মধ্যে ছয়টি উয়েফাভুক্ত দেশ অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
এছাড়া আগামী অক্টোবরে ইংল্যান্ডের মহিলা দলের গ্রিসের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্লে-অফও এই সংকটের প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে, যদি ফিফা নিজেদের অবস্থান থেকে না সরে।
উয়েফা অন্য মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থাগুলিকেও একই পথে হাঁটার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির বিশ্বাস, বিশেষ করে এশিয়ার কয়েকটি দেশও তাদের অবস্থানকে সমর্থন করতে পারে। যদিও ইনফান্তিনোর সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থনভিত্তি ঐতিহ্যগতভাবে ইউরোপের বাইরে, তবু অন্য মহাদেশগুলিতেও সমর্থন কমে গেলে তাঁর অবস্থান মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
বিবৃতিতে উয়েফা আরও অভিযোগ করেছে, “বিশ্বের জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলির সামনে এখন কার্যত একটি চরমপত্র দেওয়া হয়েছে—হয় ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলিকে স্থায়ীভাবে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে যেতে মেনে নাও, নয়তো তার পরিণতি ভোগ করো। এটি কোনও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ভয় দেখিয়ে শাসন করার চেষ্টা, যা বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক হিসেবে ফিফার মর্যাদার সঙ্গে একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।”
ইউরোপীয় ফুটবল মহলের একাধিক সূত্রের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী বছরের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ইউরোপ-সমর্থিত কোনও প্রার্থী দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে গেল।
এদিকে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফের সঙ্গেও উয়েফার আলোচনা হয়েছে। কনকাকাফ ইতিমধ্যেই ফিফার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে, যদিও তারা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বয়কটের ঘোষণা দেয়নি। বিষয়টি নিয়ে তাদের ৪১টি সদস্য দেশের জরুরি বৈঠক বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হওয়ার কথা।
ইউরোপের কয়েকটি জাতীয় ফুটবল সংস্থা ইতিমধ্যেই নিজ নিজ সরকারের সঙ্গেও আলোচনা করেছে। সূত্রের দাবি, অনেক সরকারই ব্যক্তিগতভাবে বয়কটের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছে।
ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম প্রথম রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ফিফার পরিকল্পনার প্রকাশ্য সমালোচনা করেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “বিশ্বকাপ কখনও কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না, যে সেটি বিক্রি করে দেওয়া যাবে।”
ব্রিটেনের সংস্কৃতিমন্ত্রী লিসা ন্যান্ডিও উয়েফার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, “এটি একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং আমরা এর পূর্ণ সমর্থন করছি। ফুটবল সমর্থকদের, কোনও ধনকুবের বিনিয়োগকারীর নয়। এবার নিজেদের খেলাকে রক্ষা করার জন্য দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার সময় এসেছে।”
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



