বাংলাস্ফিয়ার: প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) এবং নির্বাচন কমিশনারদের (EC) নিয়োগের জন্য গঠিত নির্বাচন কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে ফের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার শুনানিতে আদালত কেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করে, “নির্বাচন কমিটির মধ্যে ন্যায্যতার একটা দৃশ্যমান প্রকাশ থাকা উচিত নয়?” আদালত স্পষ্ট করে দেয়, তারা এই মুহূর্তে বলছে না যে নির্বাচন প্রক্রিয়া অন্যায্য, তবে ন্যায্যতা শুধু থাকলেই হবে না, তা মানুষের কাছেও দৃশ্যমান হতে হবে।

বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার বেঞ্চ প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, পরিষেবার শর্ত ও কার্যকালের মেয়াদ) আইন, ২০২৩-এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে দায়ের হওয়া একাধিক আবেদনের শুনানি করছিল।

বর্তমান আইনে নির্বাচন কমিটিতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। আবেদনকারীদের দাবি, এই ব্যবস্থায় সরকারের প্রতিনিধির সংখ্যা দুই হওয়ায় কার্যত কেন্দ্রের মতই প্রাধান্য পায় এবং বিরোধী দলনেতার ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে।

শুনানির সময় আদালত মন্তব্য করে, “আমরা বলছি না যে ন্যায্যতা নেই। কিন্তু সেটি দেখাতেও হবে।” আদালতের মতে, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জনগণের আস্থা বজায় রাখতে শুধু স্বাধীনভাবে কাজ করাই যথেষ্ট নয়, নিয়োগ প্রক্রিয়াটিও এমন হতে হবে যাতে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনও সন্দেহ না থাকে।

এর জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল আর. ভেঙ্কটরামানি কেন্দ্রের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সঙ্গে একটি বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা ও পবিত্রতা জড়িয়ে রয়েছে। তাঁর যুক্তি, প্রধানমন্ত্রী যে কমিটির সদস্য, সেই কারণে কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা মূলত তাদের নিয়োগ-পরবর্তী কার্যকলাপ ও সাংবিধানিক সুরক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়।

তবে আদালত ইঙ্গিত দেয়, স্বাধীনতার ধারণা নিয়োগের পর থেকে নয়, নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকেই শুরু হওয়া উচিত। বিচারপতিরা প্রশ্ন তোলেন, যদি কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (CBI) পরিচালকের নির্বাচন কমিটিতে নিরপেক্ষতার স্বার্থে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিত্ব থাকতে পারে, তাহলে গণতন্ত্র রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে অনুরূপ নিরপেক্ষ সদস্য কেন থাকবে না।

এই মামলার সূত্রপাত ২০২৩ সালের আইনকে ঘিরে। সুপ্রিম কোর্টের ২০২৩ সালের এক ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়েছিল, সংসদ নতুন আইন না করা পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ হবে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। পরে সংসদ নতুন আইন পাশ করে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে। সেই আইনই বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জের মুখে।

আবেদনকারীদের দাবি, নতুন আইন কার্যত সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনার উদ্দেশ্যকে দুর্বল করেছে এবং সরকারের প্রভাব বাড়িয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রের বক্তব্য, সংবিধানে কোথাও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিকে নির্বাচন কমিটিতে রাখার বাধ্যবাধকতা নেই। বিচার বিভাগের অন্তর্ভুক্তি একটি আইন প্রণয়নের বিষয়, সাংবিধানিক অপরিহার্যতা নয়।

এই মামলার শুনানি এখনও চলছে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য—এই তিনটি মৌলিক প্রশ্নেই সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় ভবিষ্যতে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।