ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া যোগ্য নাগরিকদের নাম ফেরানোর বিশেষ অভিযানে নামার মুখে নতুন দুশ্চিন্তায় পশ্চিমবঙ্গের বুথ লেভেল অফিসাররা। ট্রাইব্যুনালে আটকে থাকা আবেদনের কী হবে, সেই প্রশ্নই বারবার শুনতে হচ্ছে তাঁদের। অথচ উত্তর নিয়ে নিজেরাই সংশয়ে। স্পষ্ট নির্দেশ পেতে পুজোর পরের প্রশিক্ষণের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন বিএলওরা।

হুগলির শ্রীরামপুরের বিএলও খুরশিদ আনোয়ারের বক্তব্য, ট্রাইব্যুনালের মামলায় আটকে থাকা মানুষ তাঁকে বারবার প্রশ্ন করেন। বারাসতের সাহাবুদ্দিন মণ্ডলের বুথ থেকে ট্রাইব্যুনালে গিয়েছিল ৫৮৬টি মামলা। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৮৬ জনের নাম ইতিমধ্যে বাদ পড়েছে। তাঁরা নতুন করে আবেদন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয়ে তিনি। নারকেলডাঙার পিঙ্কি জয়সওয়ালের বুথে আবেদনকারী ২৮ জনের শুনানি সম্পর্কে কোনও খবর নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর ৬ অক্টোবর জানিয়েছে, এসআইআর চলাকালীন এএসডিডি তালিকায় চিহ্নিত ভোটারদের তথ্য অনলাইনে রয়েছে। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এবং সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের ওয়েবসাইট থেকে তা দেখা যাবে। ওই তালিকায় থাকা কোনও যোগ্য ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেলে তিনি ফর্ম ৬ জমা দিতে পারবেন। অনলাইনের পাশাপাশি বিএলওর মাধ্যমেও আবেদন করা যাবে। নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জনের তারিখে বয়স আঠারো হওয়া নতুন ভোটারদের জন্যও আবেদনের সুযোগ রয়েছে। তালিকায় নাম ফেরানোর আবেদন গ্রহণ অবশ্য স্বয়ংক্রিয় অন্তর্ভুক্তি নয়; যাচাইয়ের পরে সংশ্লিষ্ট আধিকারিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

তবে এই সুযোগ সব ধরনের বাদ পড়া ভোটারের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। ৭ অক্টোবর মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর স্পষ্ট করেছে, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের প্রত্যাখ্যাত মামলা এবং আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারাধীন আবেদন ইআরও বা ডিইও নিষ্পত্তি করতে পারবেন না। দফতরটি সুপ্রিম কোর্টের ১০ মার্চের নির্দেশের উল্লেখ করেছে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকের আদেশের বিরুদ্ধে কোনও প্রশাসনিক আধিকারিকের কাছে আপিল করা যাবে না। ফলে ট্রাইব্যুনালে আবেদন বিচারাধীন থাকলে বিশেষ অভিযানে ফর্ম ৬ জমা দিয়ে সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে নাম ফেরানোর সুযোগ মিলছে না।

বিশেষ অভিযানের পটভূমিতে রয়েছে দেশজুড়ে এসআইআরে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার বিতর্ক। নির্বাচন কমিশন ২৯ সেপ্টেম্বর নির্দেশ দেয়, যে ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর শেষ হয়েছে, সেখানে বাদ পড়া যোগ্য নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করতে উদ্যোগ নিতে হবে। আগের ও বর্তমান তালিকা মিলিয়ে চিহ্নিত করতে হবে কাদের নাম আর নেই। তাঁরা অন্য কোথাও নথিভুক্ত কি না, একই ব্যক্তির একাধিক নাম ছিল কি না, কিংবা মৃত্যু হয়েছে কি না—সেসবও যাচাইয়ের বিষয়। উদ্দেশ্য, বাদ পড়ার কারণ পরীক্ষা করে যোগ্য নাগরিককে আবেদনে সাহায্য করা।

এই পর্যায়ে ফর্ম ৬ ব্যবহারের নিয়মেও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। এসআইআরের সময় আবেদনকারী বা তাঁর বাবা-মায়ের নাম আগের এসআইআরের তালিকায় ছিল কি না, সে বিষয়ে অতিরিক্ত ঘোষণা চাওয়া হচ্ছিল। এসআইআর শেষ হয়ে যাওয়া রাজ্যগুলিতে সাধারণ নাম নথিভুক্তির ক্ষেত্রে সেই অতিরিক্ত ঘোষণা প্রযোজ্য হবে না। প্রচলিত বিধিবদ্ধ ফর্মেই আবেদন করা যাবে। অর্থাৎ নতুন অভিযানের আবেদনপদ্ধতি এবং আগের বিশেষ সংশোধনের শর্তকে এক করে দেখলে বিভ্রান্তি বাড়বে।

বিএলওদের উদ্বেগের আরেকটি দিক নিরাপত্তা ও কাজের চাপ। ভোটকর্মী ও বিএলও ঐক্য মঞ্চ আশঙ্কা জানিয়েছে, নাম বাদ পড়ায় ক্ষুব্ধ মানুষের রোষ কর্মীদের উপরে পড়তে পারে। সংগঠনটি নিরাপত্তা চেয়েছে। আবার শিক্ষকতার পাশাপাশি নির্বাচনের কাজ ও জনগণনার দায়িত্ব সামলে নতুন অভিযান কীভাবে চলবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন কর্মীরা।

ট্রাইব্যুনাল নিয়ে উদ্বেগের পিছনে রয়েছে বিপুল সংখ্যক অনিষ্পন্ন আবেদনও। কমিশনের আদালতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৮.৩১ লক্ষ আপিলের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছিল ১.২৬ লক্ষ। সব আবেদন অবশ্য নাম ফেরানোর নয়; এর মধ্যে ২২.২১ লক্ষ আবেদন করেছিলেন বাদ পড়া ভোটাররা, আর ১৬.১০ লক্ষ ছিল তালিকাভুক্ত অন্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি। ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা ইসিআইনেট ব্যবস্থায় নোটিস পাঠানো, অতিরিক্ত নথি গ্রহণ এবং আদেশের কপি পাওয়ার মতো সমস্যার কথাও জানিয়েছেন। ফলে আবেদন করা এবং তার কার্যকর নিষ্পত্তির মধ্যে ব্যবধান রয়ে যাচ্ছে।

এই অনিশ্চয়তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আসন্ন পুরভোটেও। শুধু কলকাতা পুরসভা এলাকাতেই ৮৫ হাজারের বেশি ভোটারের আপিল ট্রাইব্যুনালে ঝুলছে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে কলকাতা, হাওড়া এবং আরও কয়েকটি পুরসভায় ভোটের প্রস্তুতি চলছে। আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের ভোটদানের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএলওদের তৈরি তালিকা স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলির বুথ এজেন্টদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। যাচাইয়ের রিপোর্ট ও পূরণ করা ফর্ম যাবে ভোটার নথিভুক্তির দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের কাছে; আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন তিনিই। গৃহহীন মানুষ, শ্রমিক কলোনি ও প্রান্তিক এলাকায় বিশেষ শিবিরের ব্যবস্থাও করার কথা। এই কাঠামোয় বিএলও আবেদন করতে সাহায্য করেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করেন; নাম অন্তর্ভুক্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁর হাতে থাকে না। কমিশনের নির্দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রচারের মাধ্যমেও ভোটারদের সচেতন করার বিশেষ উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

কমিশনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, প্রত্যেক আবেদনকারীর বাড়িতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। শিবিরেও আবেদন করা যাবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বাড়িতে যাচাই করতে যাবেন বিএলও।

পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট, বিশেষ অভিযানের ঘোষণা এবং ট্রাইব্যুনালের মামলার নিষ্পত্তি দুটি পৃথক প্রক্রিয়া। কোন ভোটার কোন পথে এগোবেন, সেই পার্থক্য পরিষ্কারভাবে জানানো জরুরি। নইলে নাম ফেরানোর আশা নিয়ে আসা মানুষের প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে সেই বিএলওকেই, যাঁর কাছে আবেদন পৌঁছয়, কিন্তু যাঁর হাতে বিচারাধীন মামলার সমাধান নেই।