মহিলা সাংবাদিকদের যৌন হেনস্থার অভিযোগ ওঠার কয়েক দিনের মধ্যেই বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের বিক্ষোভ সামলাতে বডি ক্যামেরা ব্যবহার করল দিল্লি পুলিশ। মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সময় কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের পোশাকে ছোট ক্যামেরা দেখা যায়। বিক্ষোভকারী, সাংবাদিক এবং পুলিশের মধ্যে কী ঘটছে, তার ভিডিও নথি রাখতেই এই ব্যবস্থা বলে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে।

নয়াদিল্লি জেলার ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ সচিন শর্মাকেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকির সময় বডি ক্যামেরা পরতে দেখা যায়। পুলিশ সূত্রের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের কথাবার্তা ও কার্যকলাপ রেকর্ড থাকলে পরে কোনও অভিযোগ উঠলে সেই ফুটেজ প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যাবে। বিশেষ করে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচন কমিশনের দপ্তরমুখী রাস্তায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের এই ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে বিরোধীরা। মঙ্গলবার সংসদ থেকে কমিশনের সদর দপ্তরের দিকে মিছিলের কর্মসূচি ছিল ইন্ডিয়া জোটের। কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন রাস্তায় একাধিক স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়। মোতায়েন ছিল দিল্লি পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স।

এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার পটভূমিতে রয়েছে যন্তর মন্তরের কাছে আগের বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিন মহিলা সাংবাদিকের হেনস্থার অভিযোগ। তাঁদের একজন কনট প্লেসের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অব পুলিশ বিবেক ভগতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগগুলি তদন্তের জন্য ক্রাইম ব্রাঞ্চের কাছে পাঠানো হয়েছে। তদন্তকারীদের কাছে সংশ্লিষ্ট ভিডিও থাকলে তা জমা দেওয়ার আবেদনও জানানো হয়েছে।

তবে অভিযোগ জমা পড়ার পরেও এফআইআর না হওয়া নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, তখনও এই ঘটনায় এফআইআর নথিভুক্ত হয়নি। অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করার দাবিতে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার বাইরে সাংবাদিক ও অন্য প্রতিবাদকারীরা বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। সোমবার সেখান থেকে এক অভিযোগকারী সাংবাদিকসহ সতেরোজনকে আটক করা হয়।

অন্যদিকে, মহিলা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে দিল্লি পুলিশ। তাদের বক্তব্য, মহিলাদের সামলানোর দায়িত্বে মহিলা পুলিশকর্মীরা ছিলেন এবং তাঁদের মর্যাদা বজায় রাখা হয়েছে। সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। ফলে ঘটনাস্থলের আচরণ নিয়ে অভিযোগকারী ও পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।

বিতর্কের মধ্যে ভগতকে অতিরিক্ত ডিসিপির দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তও স্থগিত রাখা হয়েছে। দিল্লি সরকারের ব্যাখ্যা, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ওই দায়িত্ব নিতে চান না বলে ভগত নিজেই জানিয়েছেন। বারোজন অফিসারকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব আগেই তৈরি হয়েছিল। এটি ছিল সাময়িক ব্যবস্থা; এর সঙ্গে বাড়তি আর্থিক সুবিধা যুক্ত ছিল না। সংশোধিত নির্দেশ অন্য এগারোজনের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে।

মঙ্গলবারের মিছিলেও পুলিশ ও বিরোধী নেতাদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। ব্যারিকেড পেরিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টার সময় একাধিক বিরোধী সাংসদকে আটক করা হয়। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে। নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপি অবশ্য ভোটার তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এদিকে, বিক্ষোভ ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে নিযুক্ত দিল্লি পুলিশ এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের সদস্যদের বডি ক্যামেরা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার আবেদন জানিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা হয়েছে। আবেদনে শুধু ক্যামেরা ব্যবহারের কথা বলা হয়নি; রেকর্ড করা ফুটেজ সংরক্ষণ, তার অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের সুস্পষ্ট নিয়ম তৈরির দাবিও জানানো হয়েছে। ক্যামেরায় কী ধরা পড়ছে, সেই তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, বিতর্ক এখন সেদিকেও।

বডি ক্যামেরা ভবিষ্যতের ঘটনার নথি রাখতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু আগের অভিযোগগুলির সত্যতা নির্ধারণের জন্য স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পৃথক তদন্ত এবং সেই সময়ের উপলব্ধ প্রমাণ পরীক্ষা করা জরুরি।