যন্তর মন্তরে সভা, অবস্থান বা বিক্ষোভ করতে হলে অন্তত দশ দিন আগে অনুমতির আবেদন জানাতে হবে। বুধবার, ৭ অক্টোবর এই নিয়ম ফের মনে করিয়ে দিল দিল্লি পুলিশ। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনের মধ্যেই পুলিশের এই বক্তব্য সামনে এসেছে। আবেদন জমা দিতে হবে নয়াদিল্লি জেলার ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশের কাছে। পুলিশের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শুধু কর্মসূচি ঘোষণা করলেই সেখানে জমায়েত করা যাবে না; কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও প্রয়োজন। সভা, ধর্না বা প্রতিবাদ—সব ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়া প্রযোজ্য বলে জানানো হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, যন্তর মন্তরে সর্বাধিক এক হাজার মানুষের জমায়েতের অনুমতি দেওয়া যায়। তার চেয়ে বড় কর্মসূচির জন্য অন্য নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। এক হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার মানুষের সমাবেশের জন্য রামলীলা ময়দান এবং পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষের জমায়েতের জন্য বুরারির কথা বলা হয়েছে। ফলে আয়োজকদের পরিকল্পনায় স্থান ও সম্ভাব্য লোকসংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ।

সেন্ট্রাল ভিস্তা এলাকায় বিক্ষোভের নিষেধাজ্ঞার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। ইন্ডিয়া গেট, সি-হেক্সাগন, মান সিংহ রোড, জনপথ এবং সংলগ্ন লন এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। বিরোধীদের কর্মসূচি ঘিরে বুধবার যন্তর মন্তরের কাছে অশোকা রোডে একাধিক স্তরে ব্যারিকেড বসানো হয়। মোতায়েন করা হয় বিপুল নিরাপত্তাবাহিনী। এর মধ্যেই নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন বিরোধী সাংসদেরা।

এই বিধির পটভূমিতে রয়েছে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে মজদুর কিষান শক্তি সংগঠন বনাম কেন্দ্রীয় সরকার মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মৌলিক অধিকার স্বীকার করেছিল আদালত। পাশাপাশি জনশৃঙ্খলা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিক্ষোভ পরিচালনার ব্যবস্থা করতে বলেছিল। পুলিশের বক্তব্য, সেই রায় অনুসরণ করেই তাদের স্থায়ী নির্দেশিকা তৈরি হয়েছে।

আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। বিরোধীদের অভিযোগ, তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সেই কারণেই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চাইছেন তাঁরা। কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিবাদ আরও জোরদার হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপি অবশ্য অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বুধবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের উদ্যোগে জনপথের একটি রেস্তরাঁয় মধ্যাহ্নভোজে মিলিত হন বিরোধী নেতারা। সেখান থেকে বাসে যন্তর মন্তরের দিকে রওনা দেন তাঁরা। পথে পুলিশ বাস আটকে দিলে সাংসদেরা অবস্থানে বসেন। রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা এবং অন্য বিরোধী নেতাদের আটক করা হয়। ফলে অনুমতি সংক্রান্ত প্রশাসনিক বক্তব্যের পাশাপাশি রাজধানীর রাস্তায় ফের রাজনৈতিক সংঘাতের ছবি সামনে আসে।

প্রিয়াঙ্কা অন্য মহিলা নেত্রীদের সঙ্গে রাস্তায় শুয়ে প্রতিবাদ জানান; তাঁর হাতে ছিল সংবিধানের প্রতিলিপি। পুলিশ রাহুলকে তুলে বাসে নিয়ে যায়। মহিলা পুলিশকর্মীরা প্রিয়ঙ্কা এবং অন্য নেত্রীদের সরিয়ে দেন। আগের দিনও নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে বিরোধীদের যাত্রা আটকানো হয়েছিল। বুধবারের ঘটনাতেও প্রতিবাদের জায়গায় পৌঁছনো নিয়েই বিরোধী নেতৃত্বের সঙ্গে পুলিশের সংঘাত তৈরি হয়। আন্দোলনের দাবির সঙ্গে এবার প্রতিবাদ করার সুযোগের প্রশ্নও জুড়ে গেল।

এর মধ্যেই ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। সংগঠনের সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় সেই পরিকল্পনা জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন। আয়োজকদের দাবি, কয়েক হাজার মানুষ যোগ দিতে পারেন। তবে কর্মসূচির কথা পুলিশকে জানানো এবং অনুমতি পাওয়া আলাদা বিষয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওই কর্মসূচির অনুমোদনের কথা জানানো হয়নি।

বিরোধীদের বক্তব্য, নাগরিকের অধিকার রক্ষার আন্দোলন মামলা দিয়ে থামানো যাবে না। খাড়গে জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ চলবে। অন্যদিকে পুলিশের অবস্থান, যন্তর মন্তর অনুমোদিত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের স্থান হলেও সেখানে পূর্বানুমতি ও নির্ধারিত জনসমাগমের সীমা মানতে হবে। আসন্ন কর্মসূচির আগে তাই আবেদন, অনুমোদন এবং জমায়েতের আকার নিয়ে টানাপোড়েনই এখন সামনে।