কঙ্গোয় ইবোলার তাণ্ডব

যা জানা জরুরি
- গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোয় ইবোলার বর্তমান প্রাদুর্ভাব ইতিমধ্যেই দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
- সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত অন্তত ২,৩২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
- মৃত্যুর সংখ্যায় ২০১৮-২০ সালের ইবোলা প্রাদুর্ভাবকেও ছাপিয়ে গিয়েছে এবারের সংক্রমণ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোয় ইবোলার বর্তমান প্রাদুর্ভাব ইতিমধ্যেই দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত অন্তত ২,৩২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যায় ২০১৮-২০ সালের ইবোলা প্রাদুর্ভাবকেও ছাপিয়ে গিয়েছে এবারের সংক্রমণ। কঙ্গোর জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪,৯৪৫। শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই নতুন করে ১০১ জনের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
সংক্রমণের এই গতি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার। পশ্চিম আফ্রিকার ২০১৪-১৬ সালের মহামারিতে গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিয়োনে মোট ২৮,৬১৬ জন আক্রান্ত এবং ১১,৩২৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা, কঙ্গোয় এখন গড়ে প্রতি ৩০ মিনিটে একজন ইবোলায় মারা যাচ্ছেন।
দেশটির ২৬টি প্রদেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই ছ’টিতে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি উত্তর-পূর্বের ইতুরি প্রদেশে। এখানেই প্রথম প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হয়েছিল এবং এখনও পর্যন্ত ৩,৪০০-র বেশি সংক্রমণের খবর মিলেছে।
এটি কঙ্গোয় ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব। কিন্তু সংক্রমণের এমন দ্রুত বিস্তারের নজির আগে দেখা যায়নি। পশ্চিম আফ্রিকার মহামারিতে মৃতের সংখ্যা এক হাজারে পৌঁছতে প্রায় পাঁচ মাস সময় লেগেছিল। সেখানে কঙ্গোয় তিন মাসেরও কম সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা দুই হাজার পেরিয়ে গিয়েছে।
দুর্লভ প্রজাতি, নেই নির্দিষ্ট চিকিৎসা
এ বার সংক্রমণের জন্য দায়ী ইবোলার তুলনামূলক বিরল বুন্ডিবুগিয়ো প্রজাতি। এই প্রজাতির বিরুদ্ধে এখনও কোনও অনুমোদিত প্রতিষেধক বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে প্রায় এক হাজার আক্রান্ত ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়েছেন এবং আরও ৭৩০ জন চিকিৎসা বা নিভৃতবাস কেন্দ্রে রয়েছেন।
ইতুরি প্রদেশে গত মাস থেকে সম্ভাব্য দু’টি ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস জানিয়েছেন, বুন্ডিবুগিয়োর বিরুদ্ধে বিশেষ ভাবে তৈরি দু’টি প্রতিষেধকের মানবদেহে পরীক্ষাও চলছে।
বাড়িতেই মৃত্যু, হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই শেষ
বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন রোগী শনাক্তকরণ নিয়ে। আক্রান্তদের ৭০ শতাংশেরও বেশি চিকিৎসাকেন্দ্রে নয়, বাড়ি বা স্থানীয় সমাজের মধ্যেই মারা যাচ্ছেন বলে জানা গিয়েছে।
অনেকেই প্রথম দিকে ইবোলার উপসর্গকে সাধারণ জ্বর, বিষক্রিয়া বা অন্য কোনও অসুস্থতা ভেবে বাড়িতেই চিকিৎসা করাচ্ছেন। পরিস্থিতি গুরুতর হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক রোগী চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছনোর আগেই মারা যাচ্ছেন।
ইবোলা সাধারণত আক্রান্ত বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। পরে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, দেহরস, অঙ্গ, মৃতদেহ কিংবা দূষিত পোশাক ও বিছানার সংস্পর্শে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়ায়।
প্রথম দিকে জ্বর, প্রচণ্ড অবসাদ, পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা ও গলাব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পরে বমি, ডায়েরিয়া, পেটে ব্যথা, ত্বকে ফুসকুড়ি এবং যকৃৎ ও কিডনির গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যুদ্ধ আর অবিশ্বাসে আরও কঠিন লড়াই
ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছে কঙ্গোর দীর্ঘদিনের অস্থিরতা। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, নিরাপদ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়ে অপপ্রচার, স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন না পাওয়া এবং ধর্মঘট—সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্য পরিষেবা বারবার ধাক্কা খাচ্ছে।
এর সঙ্গে রয়েছে প্রশাসনের প্রতি স্থানীয় মানুষের অবিশ্বাস এবং দুর্বল স্বাস্থ্য ও সড়ক পরিকাঠামো। প্রত্যন্ত এলাকায় দ্রুত রোগী শনাক্ত করা, নমুনা সংগ্রহ, চিকিৎসা দেওয়া এবং আক্রান্তদের আলাদা রাখার কাজ তাই অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
জুলাইয়ে উগান্ডা নিজেকে ইবোলামুক্ত ঘোষণা করলেও প্রতিবেশী কঙ্গোয় পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে। শুধু একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নয়, আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাছেও কঙ্গোর এই ইবোলা প্রাদুর্ভাব এখন বড় পরীক্ষা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



