পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদায় সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মিঠুন, নতুন দায়িত্ব শুভেন্দু সরকারের

যা জানা জরুরি
- পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা হলেন অভিনেতা ও বিজেপি নেতা মিঠুন চক্রবর্তী।
- নতুন দায়িত্বে তাঁকে পূর্ণমন্ত্রীর সমমর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
- বুধবার, ৭ অক্টোবর প্রকাশ্যে আসা নিয়োগের খবর অনুযায়ী, রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবেন তিনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা হলেন অভিনেতা ও বিজেপি নেতা মিঠুন চক্রবর্তী। নতুন দায়িত্বে তাঁকে পূর্ণমন্ত্রীর সমমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বুধবার, ৭ অক্টোবর প্রকাশ্যে আসা নিয়োগের খবর অনুযায়ী, রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। এবার সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সেই ঘোষণায় আনুষ্ঠানিক সিলমোহর পড়ল। অভিনয় ও দলীয় প্রচারের পাশাপাশি রাজ্য প্রশাসনেও নির্দিষ্ট ভূমিকা পেলেন মিঠুন।
কর্মিবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দফতরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নিয়োগ অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। রাজ্যপালের অনুমোদনে জনস্বার্থে এই নিয়োগ করা হয়েছে। তবে পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদা পাওয়ার সঙ্গে কোনও দফতরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হওয়ার পার্থক্য রয়েছে। মিঠুনের পদটি উপদেষ্টার। তাঁকে পৃথক দফতরের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এমন কথা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়নি।
এই মুহূর্তে শুটিংয়ের কাজে আলিপুরদুয়ারে রয়েছেন মিঠুন। সেখান থেকেই নতুন দায়িত্ব দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। নবান্ন সূত্রের খবর, শীঘ্রই দায়িত্ব গ্রহণ করবেন অভিনেতা। তবে উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর কাজের পরিধি, কোন বিষয়ে তিনি সরাসরি পরামর্শ দেবেন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থায় তাঁর ভূমিকা কী হবে, তা পরবর্তী পর্যায়ে আরও স্পষ্ট হবে।
গত মাসে নিউ টাউনে উত্তমকুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে মিঠুনকে সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা করার কথা ঘোষণা করেছিলেন শুভেন্দু। চলচ্চিত্রে তাঁর দীর্ঘ অবদান এবং বাংলার সঙ্গে যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনেও মিঠুনের পরামর্শ নিয়েছে সরকার। পর্যটন-সহ আরও কয়েকটি ক্ষেত্রেও তাঁর মতামত চাওয়া হয়েছে। ফলে নতুন পদে নিয়োগের আগে থেকেই সাংস্কৃতিক ও সংশ্লিষ্ট কিছু উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ চলছিল।
উত্তমকুমার ফিল্ম সেন্টারের পরিকল্পনাটি এই নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি। নিউ টাউনের প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য। সেখানে চলচ্চিত্র প্রদর্শন, গবেষণা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা তৈরির কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত কেন্দ্রে সিনেমা হল, প্রেক্ষাগৃহ এবং চলচ্চিত্রের নির্মাণ-পরবর্তী কাজের সুবিধা থাকবে। অর্থাৎ স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি চলচ্চিত্রশিল্পের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দু’টি হলে ৭৫০ জন করে দর্শক বসতে পারবেন। অন্য একটি প্রেক্ষাগৃহে থাকবে এক হাজার আসন। অ্যানিমেশন, ভিজুয়াল এফেক্টস এবং পোস্ট প্রোডাকশনের সুবিধার কথাও বলা হয়েছে। এই পরিকাঠামো তৈরি হলে ছবি দেখানোর পাশাপাশি নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ একই কেন্দ্রে করার সুযোগ মিলতে পারে।
সেপ্টেম্বরের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক, যিশু সেনগুপ্ত এবং পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী-সহ চলচ্চিত্রজগতের একাধিক পরিচিত মুখ উপস্থিত ছিলেন। উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, প্রদর্শনশালা এবং তাঁর জীবনের সঙ্গে যুক্ত স্থানগুলি ঘিরে ঐতিহ্যভ্রমণের কথাও জানিয়েছিল সরকার। সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মধ্যেই মিঠুনের নতুন ভূমিকার ঘোষণা এসেছিল। এখন সেই ঘোষণার প্রশাসনিক রূপ পেল উপদেষ্টা পদ।
চলচ্চিত্র প্রযোজনা বাড়ানোর বিষয়েও ইতিমধ্যে প্রস্তাব দিয়েছেন মিঠুন। খবর অনুযায়ী, বাংলায় শুটিং করতে আসা প্রযোজনাগুলির জন্য ৩০ শতাংশ ভর্তুকি চেয়েছিলেন তিনি। মিঠুন জানিয়েছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী সেই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন। তবে প্রস্তাবে সম্মতি এবং বিস্তারিত সরকারি প্রকল্প চালু হওয়া আলাদা বিষয়। ভর্তুকির যোগ্যতা, হিসাবের পদ্ধতি কিংবা আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ওই প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য নেই।
রাজনৈতিকভাবেও এই নিয়োগ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেন মিঠুন। তারপর বাংলায় দলের অন্যতম পরিচিত প্রচারমুখ হয়ে ওঠেন তিনি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও ব্যাপক প্রচার করেছেন। এবার বিজেপি পরিচালিত সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর ভূমিকা আনুষ্ঠানিক হল। নির্বাচনী সভায় জনপ্রিয় অভিনেতার উপস্থিতির সঙ্গে এবার যুক্ত হচ্ছে সাংস্কৃতিক নীতি ও সরকারি উদ্যোগ নিয়ে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব।
মিঠুনের রাজনৈতিক যাত্রায় অবশ্য তৃণমূলের অধ্যায়ও রয়েছে। ২০১৪ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল। ২০১৬ সালে তিনি রাজ্যসভার সদস্যপদ ছাড়েন। পরে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বদলায়। সেই অতীতের নিরিখে বর্তমান নিয়োগ তাঁর জনজীবনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। সংসদীয় অভিজ্ঞতার পরে এবার রাজ্য সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেলেন তিনি।
চলচ্চিত্রে মিঠুনের অভিজ্ঞতা প্রায় পাঁচ দশকের। মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ দিয়ে ১৯৭৬ সালে তাঁর অভিনয়জীবন শুরু। প্রথম ছবিতেই সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান। পরবর্তী সময়ে ‘ডিস্কো ডান্সার’ তাঁকে দেশে এবং বিদেশে বিপুল জনপ্রিয়তা দেয়। নাচ, অ্যাকশন, সামাজিক ছবি ও চরিত্রাভিনয়ে কাজ করে তিনি বাংলা এবং হিন্দি, দুই চলচ্চিত্রজগতেই নিজস্ব জায়গা তৈরি করেছেন।
‘তাহাদের কথা’ এবং ‘স্বামী বিবেকানন্দ’-এ অভিনয়ের জন্যও জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন মিঠুন। ২০২৪ সালে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় দাদাসাহেব ফালকে সম্মান। শিল্পমানসমৃদ্ধ ছবি থেকে মূলধারার বাণিজ্যিক বিনোদন পর্যন্ত বিস্তৃত এই অভিজ্ঞতা সাংস্কৃতিক উপদেষ্টার কাজে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। বিশেষ করে বাংলা ও মুম্বইয়ের চলচ্চিত্রশিল্পে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। পুণের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার প্রাক্তন ছাত্র মিঠুন সাড়ে তিনশোর বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন বলে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। বাংলা ও হিন্দির পাশাপাশি ওড়িয়া, ভোজপুরি এবং তেলুগু ছবিতেও কাজ করেছেন তিনি। তাঁর অভিনয়জীবনের পরিচিতি তাই একটি ভাষার চলচ্চিত্রশিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এই নিয়োগের পর নজর থাকবে দায়িত্বের বাস্তব প্রয়োগে। চলচ্চিত্রের পরিকাঠামো, শুটিংয়ের সুযোগ এবং শিল্পীদের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগে উপদেষ্টার ভূমিকা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়ে ওঠে, তা কাজ শুরু হওয়ার পর বোঝা যাবে। আপাতত নিশ্চিত, মিঠুনকে পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদায় সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা করেছে রাজ্য। তাঁর পরামর্শ কোন কোন পরিকল্পনায় জায়গা পায় এবং সেগুলি কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



