দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে মাঝআকাশের রক্তাক্ত সংঘর্ষকে সন্ত্রাসবাদী হামলার চেষ্টা বলে দাবি করলেন ইজরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভির। তাঁর অভিযোগ, অভিযুক্ত বিমানটি আছড়ে ফেলে ইজরায়েলি যাত্রীদের হত্যা করতে চেয়েছিলেন। বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনায় বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে। যাত্রীরা নিরাপদে রয়েছেন বলে জানিয়েছে বিমানসংস্থা।

বেন গাভির একটি বিবৃতিতে অভিযুক্তকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দেন। তাঁর দাবি, বিমানে থাকা ১৮০ জন ইজরায়েলিকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল। শত্রুরা জীবনের মূল্য বোঝে এবং তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো উচিত—এমন ধারণাকেও আক্রমণ করেন তিনি। তবে মন্ত্রীর উল্লেখ করা যাত্রীসংখ্যা এবং হামলার উদ্দেশ্যকে স্বাধীন তদন্তে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে ধরে নেওয়া যাচ্ছে না।

ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ উড়ানটি জর্ডনের আকাশসীমায় থাকাকালীন বিপদের মুখে পড়ে। উড়ান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, বিমান থেকে প্রথমে সাধারণ জরুরি সংকেত, পরে সম্ভাব্য বেআইনি হস্তক্ষেপের সংকেত পাঠানো হয়। এরপর ফের সাধারণ জরুরি সংকেত আসে। শেষ পর্যন্ত বিমানটি নির্ধারিত গন্তব্যের বদলে উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নামে।

প্রথম বিপদসংকেত পাঠানোর আগে বিমানটি তিরিশ সেকেন্ডেরও কম সময়ে প্রায় ১৪ হাজার ফুট নেমে এসেছিল বলে উড়ানের তথ্য থেকে মনে হচ্ছে। এই আকস্মিক পতন যাত্রীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করে। সংকেতগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা প্রাথমিকভাবে স্পষ্ট ছিল না।

ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় ইজরায়েল যুদ্ধবিমানও পাঠিয়েছিল বলে সে দেশের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। দুবাই–তেল আভিভ উড়ান সাধারণত সৌদি আরব ও জর্ডনের আকাশসীমা ব্যবহার করে। ইজরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। যাত্রীদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর।

যাত্রীদের পরিবারের বয়ানে উঠে এসেছে ককপিটের ভয়াবহ পরিস্থিতি। যাত্রী মিরিয়ামের মা ইয়াসমিন জানান, তাঁর মেয়ে চিৎকার শুনেছিলেন। এক ব্যক্তিকে ছুরি হাতে একজন পাইলটকে মেঝেতে চেপে ধরতে দেখা যায় বলে মেয়ে তাঁকে জানিয়েছিলেন। চারপাশে রক্ত ছিল। অন্য বিবরণে যাত্রীদের এগিয়ে গিয়ে হামলাকারীকে আটকানোর কথা এসেছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রতিটি বিবরণের স্বাধীন যাচাই তখনও সম্পূর্ণ হয়নি।

ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাৎজও ঘটনাটিকে জঙ্গি হামলার চেষ্টা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, কয়েকজন ইজরায়েলি যাত্রী ককপিটে ঢুকে অভিযুক্তকে কাবু করায় বিপর্যয় এড়ানো যায়। দুই ইজরায়েলি আধিকারিক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তাঁদের প্রাথমিক মূল্যায়নেও এটি সন্ত্রাসের চেষ্টা। তাঁদের দাবি, সহকারী পাইলট ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করেন; তারপর কেবিনের কর্মীরা ককপিটে ঢোকেন। আহত ক্যাপ্টেন ভারতীয় নাগরিক বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাঁর বক্তব্য, এক পাইলট অন্যজনকে ছুরিকাঘাত করে সম্ভবত বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। যাত্রীদের ভূমিকার প্রশংসাও করেন তিনি। তাবুক বিমানবন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে বিমানটি নামে। ক্যাপ্টেন এবং সহকারী পাইলট, দু’জনকেই আহত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়।

যদিও ইজরায়েলের প্রাথমিক সরকারি প্রতিক্রিয়া ছিল আলাদা। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান রয়টার্সকে প্রথমে জানিয়েছিলেন, ঘটনাটিকে বিমান ছিনতাই বলে মনে করা হচ্ছে না; এটি অন্য ধরনের ঘটনা। পরে মন্ত্রীদের বক্তব্যে সন্ত্রাসের অভিযোগ সামনে আসে। ফলে ঘটনার সময়ক্রম, হামলার উদ্দেশ্য এবং ককপিটে ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্লাইদুবাইয়ের প্রাথমিক বিবৃতিতে মাঝপথে একটি ঘটনার জন্য উড়ান ঘুরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংস্থা নিশ্চিত করেছে, বিমান নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং সমস্ত যাত্রীর হিসাব পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু তাদের ওই বিবৃতিতে সন্ত্রাসের উদ্দেশ্য নিশ্চিত করা হয়নি। আপাতত নিশ্চিত তথ্য হল নিরাপদ অবতরণ ও দুই পাইলটের আহত হওয়া; পরিকল্পিত গণহত্যার অভিযোগটি ইজরায়েলি নেতৃত্বের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচ্য।