ককপিটে ছুরির আঘাতে গুরুতর জখম হয়েও যাত্রীদের প্রাণ বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। তাঁর সেই সাহসিকতাকে কুর্নিশ জানালেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে স্মিতের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি তাঁকে ‘প্রকৃত নায়ক’ বলেছেন। আহত পাইলটের দ্রুত এবং সম্পূর্ণ আরোগ্যও কামনা করেছেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী।

এক্সে প্রকাশিত বার্তায় নেতানিয়াহু জানান, গুরুতর আহত অবস্থাতেও স্মিত আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যান। তিনি ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ায় যাত্রী ও বিমানকর্মীরা ভিতরে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করার সুযোগ পান। নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় ক্যাপ্টেনের এই তৎপরতায় ইজরায়েলি নাগরিক এবং অন্য দেশের মানুষ মিলিয়ে ১৭৪ জনের প্রাণ বাঁচে। আকাশে ভয়াবহ বিপর্যয় প্রতিরোধে তাঁর এই ভূমিকাকে অসাধারণ সাহসিকতার নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ উড়ানে। দুবাই থেকে তেল আভিভ যাওয়ার পথে বোয়িং বিমানটির ককপিটে সংঘর্ষ বাধে। ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সহকারী পাইলট ক্যাপ্টেনকে ছুরি মেরে বিমানটি ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতির অবনতি হলে বিমান থেকে জরুরি সংকেত পাঠানো হয়। নির্ধারিত গন্তব্যের বদলে সেটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। দুই পাইলটকেই পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

নেতানিয়াহুর আগের বিবৃতিতে উঠে এসেছিল যাত্রী ও বিমানকর্মীদের প্রতিরোধের কথাও। তিনি জানান, এক ইজরায়েলি যাত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। ওই যাত্রী এবং একজন বিমানকর্মী ককপিটে ঢুকে অভিযুক্তকে নিরস্ত করেন। সেই সময়ে অভিযুক্ত বিমানের যন্ত্রপাতির ক্ষতি করার চেষ্টা করছিলেন বলে অভিযোগ। পরে আরেকজন বিমানকর্মী ককপিটে ঢুকে বিমানটিকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলেও জানান নেতানিয়াহু।

বিমানসংস্থা ফ্লাইদুবাই ককপিটে সংঘর্ষের কথা নিশ্চিত করেছে। তাদের বক্তব্য, বিমানে উপস্থিত কর্তব্যরত কর্মীরাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং বিমানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। সব যাত্রী নিরাপদ রয়েছেন বলেও জানিয়েছে সংস্থা। ঘটনার তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করছে তারা। তবে পাইলটদের পরিচয় বা জাতীয়তা বিমানসংস্থার তরফে প্রকাশ করা হয়নি। স্মিতের পরিচয় এবং তাঁর ভূমিকার তথ্য উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে।

স্মিতের দীর্ঘ পেশাগত জীবনের বড় অংশ কেটেছে বোয়িং ৭৩৭ বিমান চালিয়ে। তাঁর লিঙ্কডইন প্রোফাইলের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্যিক বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা তেরো বছরের বেশি। ২০১১ সালের জুনে তিনি স্পাইসজেটে যোগ দেন। সেখানে প্রায় এগারো বছর কাজ করার সময়ে সিনিয়র কমান্ডার এবং প্রশিক্ষক পাইলটের দায়িত্ব সামলেছেন। ২০২২ সালের জুনে যোগ দেন ফ্লাইদুবাইয়ে। তাঁর প্রোফাইলে প্রায় ৯,৭৫০ ঘণ্টা উড়ানের অভিজ্ঞতার উল্লেখ রয়েছে। শুধু নিজে বিমান চালানোই নয়, অন্য পাইলটদের প্রশিক্ষণ ও তাঁদের কাজের মূল্যায়নের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। উড়ান পরিচালনার নিরাপত্তা এবং নিয়ম মেনে কাজ করার ক্ষেত্রেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

এদিকে ঘটনাটিকে ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। বিমান থেকে বিপদসংকেত পাওয়ার পরে সম্ভাব্য ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় ইজরায়েল যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল। নেতানিয়াহু ঘটনাটিকে গুরুতর নিরাপত্তাজনিত বিপদ বলে বর্ণনা করেছেন। ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজ একে সন্ত্রাসবাদী হামলার চেষ্টা বলেছেন। তবে এই বক্তব্য ইজরায়েলি সরকারের মূল্যায়ন; হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তখনও প্রকাশিত হয়নি। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং তদন্তে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের মধ্যে এই পার্থক্য রয়েছে।

নিরাপদ অবতরণের পরে আটকে পড়া যাত্রীদের অন্য বিমানে ইজরায়েলে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁদের প্রাণরক্ষায় যাত্রী, বিমানকর্মী এবং আহত ক্যাপ্টেনের সম্মিলিত ভূমিকা সামনে এসেছে বিভিন্ন বিবরণে। সেই বৃহত্তর উদ্ধারপর্বের মধ্যেই স্মিতের ব্যক্তিগত সাহসিকতাকে আলাদা করে স্বীকৃতি দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তাঁর বার্তার কেন্দ্রে রয়েছে ছুরিকাহত এক পাইলটের প্রতিরোধ এবং ককপিটের দরজা খুলে অন্যদের সাহায্য করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার