হাইলাইটস:

  • তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদাম ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৪।
  • আহত অন্তত ১৮ জন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
  • ধ্বংসস্তূপে আরও শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা, রাতদিন চলছে উদ্ধার অভিযান।
  • সেনাবাহিনী, এনডিআরএফ, দমকল, পুলিশ ও সিভিল ডিফেন্স যৌথভাবে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে।
  • প্রাক্তন কলকাতা পুরসভার বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক (ওএসডি) কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রেপ্তার।
  • মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, নির্মাণের অনুমোদন ও নজরদারিতে গুরুতর অনিয়ম হয়েছিল।

বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার তারাতলায় নির্মীয়মাণ বহুতল গুদাম ভেঙে পড়ার ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। শুক্রবার পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪। আহত অন্তত ১৮ জন। উদ্ধারকারী বাহিনীর আশঙ্কা, বিপুল পরিমাণ লোহার বিম ও কংক্রিটের নিচে এখনও কয়েকজন শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন। সেই কারণে দ্বিতীয় দিনের মতো রাতভর চলেছে উদ্ধার অভিযান।

দুর্ঘটনাস্থলে কার্যত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে সেনাবাহিনী, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), দমকল, পুলিশ, সিভিল ডিফেন্স এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের কর্মীরা। বিশাল আকারের কংক্রিটের স্ল্যাব সরাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ভারী ক্রেন, হাইড্রোলিক কাটার এবং বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে কোনও জীবিত ব্যক্তি আটকে আছেন কি না, তা খুঁজতে তাপ-সংবেদনশীল যন্ত্র এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হয়েছে।

উদ্ধারকাজে যুক্ত এক পুলিশ আধিকারিক জানান, প্রতিটি কংক্রিটের স্তর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সরানো হচ্ছে। কারণ দ্রুত ভারী যন্ত্র ব্যবহার করলে যদি কেউ জীবিত অবস্থায় আটকে থাকেন, তবে তাঁর জীবন আরও বিপন্ন হতে পারে। সেই কারণে উদ্ধার অভিযান সময়সাপেক্ষ হলেও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে।

ঘটনার পর থেকেই এসএসকেএম হাসপাতাল-সহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা চলছে। বহু শ্রমিকের শরীরে একাধিক জায়গায় গুরুতর আঘাত, হাড় ভেঙে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের মতো জটিল সমস্যা দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকদের একটি বিশেষ দল তাঁদের উপর নজর রাখছেন।

এদিকে দুর্ঘটনার তদন্তে বড় পদক্ষেপ করল পুলিশ। শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক (ওএসডি) কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তিনি একসময় কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তদন্তকারীদের অভিযোগ, নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন, নথি যাচাই এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এর আগে এই ঘটনায় কলকাতা পুরসভার তিন জন ইঞ্জিনিয়ারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, নির্মাণের নকশা অনুমোদন, তদারকি এবং নিরাপত্তা বিধি মানার ক্ষেত্রে একাধিক গুরুতর গাফিলতি ছিল। নির্মীয়মাণ ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব নিয়ে যথাযথ পরীক্ষা হয়েছিল কি না, নির্মাণে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেই সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র আক্রমণ শানান পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত কলকাতা পুর প্রশাসনের বিরুদ্ধে। তাঁর অভিযোগ, নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধি উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই দুর্ঘটনা নিছক নির্মাণ ত্রুটি নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অনিয়মের ফল।

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করার পথ অনুসরণ করা হবে। পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে চলা বড় নির্মাণ প্রকল্পগুলির নিরাপত্তা নিরীক্ষারও নির্দেশ দিয়েছে সরকার। নির্মাণের অনুমোদন, কাঠামোগত নকশা এবং নিরাপত্তা মান পুনর্বিবেচনার কাজ শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের দাবি, এই দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং শুধু প্রশাসনিক কর্মীদের নয়, প্রকল্পের মালিক, নির্মাণ সংস্থা, নকশা প্রস্তুতকারী এবং তদারকির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রুখতে নির্মাণ শিল্পে নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে কার্যকর করাই সবচেয়ে জরুরি।

ঘটনার পর তারাতলা এলাকায় এখনও থমথমে পরিবেশ। ধ্বংসস্তূপের বাইরে উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যদের অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না। নিখোঁজ শ্রমিকদের খোঁজে তাঁদের উৎকণ্ঠা ক্রমশ বাড়ছে। উদ্ধারকারী বাহিনী জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপ সম্পূর্ণ সরিয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান বন্ধ করা হবে না।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু এক নির্মাণ প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়, বরং নগর উন্নয়ন, নির্মাণ নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর তদন্তের পরবর্তী ধাপই নির্ধারণ করবে, এই বিপর্যয়ের জন্য শেষ পর্যন্ত কারা আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন।

তারাতলা গুদাম ধস মামলায় গ্রেপ্তার ‘কালী’