হাইলাইটস:

  • অনশনের ১৯তম দিনে সোনম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ দিল্লি হাইকোর্টের।
  • কেন্দ্র ও দিল্লি সরকারকে প্রতিদিন স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রিপোর্ট সংরক্ষণের নির্দেশ।
  • জোর করে খাওয়ানোর আবেদন নিয়ে আদালতে শুনানি, এখনও অনশন ভাঙতে রাজি নন ওয়াংচুক।
  • ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুকের দাবি, শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল, তাই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
  • লাদাখের পরিবেশ ও সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন তিনি।

বাংলাস্ফিয়ার: লাদাখের পরিবেশকর্মী ও উদ্ভাবক সোনম ওয়াংচুকের অনশন ঘিরে উদ্বেগ যত বাড়ছে, ততই সক্রিয় হচ্ছে বিচারব্যবস্থা। অনশনের ১৯তম দিনে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে দায়ের হওয়া এক আবেদনের শুনানিতে দিল্লি হাইকোর্ট কেন্দ্র ও দিল্লি সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং নিয়মিত চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি সংরক্ষণ করতে হবে। আদালত স্পষ্ট করেছে, একজন অনশনকারীর জীবন রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তবে তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

এই মামলায় আবেদনকারীর দাবি ছিল, দীর্ঘ অনশনের ফলে ওয়াংচুকের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাই তাঁকে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করে প্রয়োজন হলে জোর করে পুষ্টি ও চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হোক। তবে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে সেই আবেদন মঞ্জুর না করে প্রথমে তাঁর প্রকৃত শারীরিক অবস্থার উপর নজরদারি জোরদারের নির্দেশ দেয়। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে, তাই প্রতিদিন স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যদিকে, সোনম ওয়াংচুক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি এখনও অনশন প্রত্যাহারের কোনও সিদ্ধান্ত নেননি। বুধবার প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় তিনি নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আবেদন জানান সমর্থকদের। তাঁর কথায়, চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এমন কোনও ইঙ্গিত মেলেনি যে আগামী দু-চার দিনের মধ্যেই তাঁর প্রাণসংশয় দেখা দেবে।

ওয়াংচুক বলেন, “আমার শরীরের পেশি কিছুটা ক্ষয় হচ্ছে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমার হৃদ্‌যন্ত্র, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এবং পরীক্ষার রিপোর্ট এখনও স্থিতিশীল। তাই আমি আরও কিছুদিন অনশন চালিয়ে যেতে পারব।”

তিনি আরও বলেন, অনেকেই মানবিক কারণ দেখিয়ে তাঁকে অনশন ভাঙার অনুরোধ করছেন। কিন্তু এখন অনশন শেষ করলে সরকারের কাছে ভুল বার্তা যাবে যে আন্দোলনটি গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, আন্দোলনের লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই অহিংস প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়াই প্রয়োজন।

সোনম ওয়াংচুকের এই অনশন কেবল ব্যক্তিগত প্রতিবাদ নয়, বরং লাদাখের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের দাবির অংশ। তিনি এবং তাঁর সমর্থকদের অভিযোগ, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার পর লাদাখের পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং স্থানীয় মানুষের অধিকার যথেষ্ট সুরক্ষিত নয়। দ্রুত শিল্পায়ন, খনিজ সম্পদ আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মিলিয়ে এই সংবেদনশীল পার্বত্য অঞ্চলের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

ওয়াংচুক দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন, লাদাখকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দিতে হবে যাতে ভূমি, কর্মসংস্থান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের উপর স্থানীয় মানুষের অধিকার নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিশেষ আইন প্রণয়নের দাবিও তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, হিমালয়ের এই অঞ্চল শুধু লাদাখবাসীর নয়, গোটা দেশের জলসম্পদ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনশন চলাকালীনও তিনি আন্দোলনকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। ভিডিও বার্তায় তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, কেউ যেন হিংসাত্মক পথে না হাঁটেন। শান্তিপূর্ণ মিছিল, গণঅনশন এবং গণতান্ত্রিক উপায়েই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তিনি নিজেও একটি শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

এদিকে, তাঁর সমর্থনে বিভিন্ন সংগঠনও আন্দোলনের কর্মসূচি জোরদার করেছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি সংগঠন বৃহস্পতিবার গণঅনশনের ডাক দিয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরাও ওয়াংচুকের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।

দিল্লি হাইকোর্টে শুনানির সময় সরকার পক্ষ জানায়, ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে চিকিৎসকেরা নিয়মিত নজর রাখছেন। আদালত অবশ্য মৌখিক আশ্বাসে সন্তুষ্ট না থেকে লিখিতভাবে নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য নথিভুক্ত রাখার নির্দেশ দেয়। আদালতের মতে, ভবিষ্যতে পরিস্থিতির অবনতি হলে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মামলায় আদালতের সামনে দুটি সাংবিধানিক প্রশ্ন থাকে। একদিকে একজন নাগরিকের নিজের শরীর ও প্রতিবাদের অধিকার, অন্যদিকে তাঁর জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই আদালত সাধারণত এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করে, যাতে ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ না হয়, আবার প্রয়োজনে জীবনরক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়া যায়।

অনশনকে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অহিংস অস্ত্র হিসেবে দেখা হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নানা গণআন্দোলনেও অনশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে দীর্ঘ অনশন শরীরের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, প্রথম দিকে শরীর জমে থাকা শক্তি ব্যবহার করলেও পরে পেশি ক্ষয়, রক্তচাপের ওঠানামা, কিডনি ও হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়াংচুক অবশ্য বারবার জানিয়েছেন, তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাচ্ছেন এবং নিজের অবস্থার বিষয়ে স্বচ্ছ রয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক দাবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনশন করছেন। তাই তাঁর আন্দোলনকে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখা উচিত।

এখন নজর দিল্লি হাইকোর্টের পরবর্তী শুনানির দিকে। আদালত সরকারের কাছ থেকে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের রিপোর্ট চাইতে পারে এবং পরিস্থিতির অবনতি হলে নতুন নির্দেশও দিতে পারে। একই সঙ্গে অনশন ভাঙানো বা জোর করে চিকিৎসা দেওয়ার প্রশ্নে আদালত কী অবস্থান নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

একদিকে আদালতের স্বাস্থ্য-নজরদারির নির্দেশ, অন্যদিকে ওয়াংচুকের অনশন চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত—এই দুইয়ের মধ্যে আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার উপরই নির্ভর করবে এই আন্দোলনের পরবর্তী অধ্যায়। লাদাখের পরিবেশ, মানুষের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের প্রশ্নে এই অনশন ইতিমধ্যেই জাতীয় স্তরে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।