Home খবর ট্রাম্পের ‘ইরান চুক্তি’: অসম্ভব যুদ্ধের অবাস্তব লক্ষ্য থেকে বাস্তবতার কাছে আত্মসমর্পণ

ট্রাম্পের ‘ইরান চুক্তি’: অসম্ভব যুদ্ধের অবাস্তব লক্ষ্য থেকে বাস্তবতার কাছে আত্মসমর্পণ

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
12 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল পরমাণু কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প ও আঞ্চলিক প্রভাব সম্পূর্ণ ধ্বংস করা।
  • শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে ইরানের কাছ থেকে শুধু পরমাণু অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতি এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার আশ্বাসই মিলেছে।
  • ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে কোনও বাধ্যতামূলক শর্ত নেই।
  • হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাই আমেরিকাকে সমঝোতার পথে যেতে বাধ্য করেছে।
  • রিপাবলিকান দলের একাংশ এই চুক্তিকে “দশকের সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতির ভুল” বলে আক্রমণ করছে।
  • বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে দ্রুত যুদ্ধবিরতি ছাড়া ট্রাম্পের সামনে অন্য পথ ছিল না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তখন তাঁর লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তিনি চেয়েছিলেন ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প ভেঙে দিতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে হেজবোল্লা, হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলিকে দেওয়া সমর্থন বন্ধ করাতে। কিন্তু যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে যে সমঝোতা তৈরি হয়েছে, তা সেই ঘোষিত লক্ষ্যগুলির তুলনায় অনেক বেশি সীমিত এবং বাস্তববাদী।

চুক্তি অনুযায়ী, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন বন্ধ করার বিষয়ে কোনও স্পষ্ট লিখিত প্রতিশ্রুতি নেই। বরং লেবাননে যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থাকে হেজবোল্লা নিজেদের বিজয় হিসেবেই তুলে ধরছে।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ঠেলে দিচ্ছিল। ইরান বহু বছর ধরে অসম যুদ্ধ বা ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’-এর কৌশল তৈরি করেছে। সরাসরি সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও তারা এমন জায়গায় আঘাত হানতে সক্ষম, যেখানে তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী পড়ে।

মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট কূটনীতিক বারবারা লিফের মতে, মার্কিন প্রশাসন শুরু থেকেই ইরানের স্থিতিস্থাপকতাকে ভয়াবহভাবে খাটো করে দেখেছিল। তাদের ধারণা ছিল, দ্রুত সামরিক চাপ প্রয়োগ করলেই তেহরান নতি স্বীকার করবে। বাস্তবে দেখা গেল, ইরান হরমুজ প্রণালী, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও মিত্র ঘাঁটির নিরাপত্তা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম।

ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে তার প্রভাব তত বেড়েছে। তেলের দাম, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাজারে অস্থিরতা আমেরিকার ভোক্তাদের ওপরও চাপ তৈরি করেছে। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা “বিশ্বব্যাপী মন্দা” ডেকে আনতে পারত।

এখন ট্রাম্পের সামনে একটি রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে যে কঠোর অবস্থান তিনি নিয়েছিলেন, চুক্তির বাস্তবতা তার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। সেই কারণেই হোয়াইট হাউস চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ করতে দীর্ঘ সময় নিয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

রিপাবলিকান দলের ভেতর থেকেই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। লুইজিয়ানার বিদায়ী সিনেটর বিল ক্যাসিডি এই চুক্তিকে “দশকের সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতির ভুল” বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ইরানের পরমাণু উচ্চাকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি রোধ করা যায়নি এবং তারা বুঝে গেল যে হরমুজ প্রণালীকে চাপের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে আমেরিকাকে ছাড় দিতে বাধ্য করা যায়।

উত্তর ক্যারোলিনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসও বলেছেন, প্রকাশিত শর্তগুলি দেখে তিনি এখনও এটিকে ভালো চুক্তি বলতে পারছেন না।

এই সমালোচনার মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিদ্রূপ হলো, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ইরান পরমাণু চুক্তি (JCPOA)-কে আক্রমণ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে ওবামা প্রশাসন ইরানকে বিপুল আর্থিক সুবিধা দিয়েছিল। অথচ নিজের প্রশাসনের চুক্তিতে ট্রাম্পকেই এখন হিমায়িত ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতির মতো বিষয়গুলিকে সমর্থন করতে হচ্ছে।

এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্পের বক্তব্য ইরানের যুক্তির কাছাকাছিও পৌঁছে গেছে। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে, তাহলে ইরান কেন তা রাখতে পারবে না— সেই প্রশ্ন পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রসঙ্গেও তিনি তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন।

তবে সমর্থকরা বলছেন, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে এই সমঝোতা অনেক ভালো। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক এবং জেসিপিওএ আলোচনার অন্যতম মুখ রবার্ট ম্যালির মতে, দুটি চুক্তির তুলনা পুরোপুরি সঠিক নয়, কারণ দুই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর মতে, সামনে যে বিকল্পগুলি ছিল, তার মধ্যে এই সমঝোতাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

সারকথা, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ শুরু করেছিল সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে, কিন্তু শেষ করেছে বাস্তবতার কাছে নতি স্বীকার করে। সামরিক জয় নয়, অর্থনৈতিক চাপ এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিই শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে এনেছে। যুদ্ধ হয়তো আপাতত থেমেছে, কিন্তু ইরান, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমীকরণ যে পুরোপুরি বদলে যায়নি, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোনও দ্বিমত নেই।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles