Table of Contents
পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের (পিওকে) বিধানসভা নির্বাচন এবার নজিরবিহীন অস্থিরতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ২৭ জুলাই এক দফায় ভোটের পরিবর্তে তিন দফায় নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান। ভোটের মধ্যেই চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযান এবং ব্যাপক বিক্ষোভ। গত এক সপ্তাহেই প্রায় ৪০ জন নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। ভারত এই দমননীতির নিন্দা করেছে, আর রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার প্রধান স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের অভিযোগ, এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে ভারত—যা নয়াদিল্লি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে, এত বছর ধরে শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আসন থাকার পরেও এবার কেন এত তীব্র অস্থিরতা?
২০২৬ সালের নির্বাচন: কোথায় বিতর্ক?
পিওকে বিধানসভায় মোট ৫৩টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি মহিলাদের জন্য, একটি আলেমদের জন্য, একটি বিদেশে বসবাসকারী কাশ্মীরিদের জন্য এবং একটি প্রযুক্তিবিদদের জন্য সংরক্ষিত। ফলে সরাসরি নির্বাচন হয় ৪৫টি আসনে।
কিন্তু সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হল ১২টি সংরক্ষিত আসন, যা ১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে চলে যাওয়া শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দ। এই শরণার্থীরা বর্তমানে পিওকে নয়, পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে বসবাস করেন। ২ আগস্ট এই ১২টি আসনেরও ভোটগ্রহণ হয়েছে।
এই ১২টি সংরক্ষিত আসন বাতিলের দাবিই এখন জনআন্দোলনের মূল ইস্যু।
কারা এই জেএএসি?
জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) ব্যবসায়ী, আইনজীবী, পরিবহণ কর্মী, ছাত্র এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের যৌথ মঞ্চ।
২০২৩ সালে গমের মূল্যবৃদ্ধি, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল, সরকারি কর্তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের উত্থান। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে তারা ৩৮ দফা দাবি পেশ করে। অধিকাংশ দাবিই ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো উন্নয়ন, জলবিদ্যুৎ থেকে ন্যায্য রাজস্ব এবং পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের সমান আর্থিক সুবিধা পাওয়া নিয়ে।
সরকার অনেক দাবিই নীতিগতভাবে মেনে নিলেও জানিয়েছে, সংরক্ষিত আসন তুলে দিতে হলে সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন।
২০১৯-এর পর বদলে যায় পরিস্থিতি
পাকিস্তানি বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা মনে করেন, ২০১৯ সালে ভারত জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করার পর থেকেই পিওকের মানুষের মনোভাব বদলাতে শুরু করে।
এতদিন পিওকের ভবিষ্যৎ কাশ্মীর সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হত। কিন্তু ভারতের পদক্ষেপের পর বহু মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন—যদি বাস্তবে পাকিস্তানের সঙ্গেই থাকতে হয়, তাহলে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের মতো সমান অধিকার ও উন্নয়ন কেন মিলবে না?
এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক মনোভাবই জেএএসি-কে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেয়।
১২টি সংরক্ষিত আসন নিয়ে আপত্তি কোথায়?
সবচেয়ে বড় অভিযোগ হল, এই আসনগুলির ভোটাররা পিওকের বাসিন্দা নন। তাঁরা পাকিস্তানের পাঞ্জাব, খাইবার পাখতুনখোয়া, সিন্ধ, বেলুচিস্তান এবং ইসলামাবাদে বসবাস করেন।
ফলে পিওকের মানুষ এই আসনগুলিতে ভোট দিতে পারেন না, প্রার্থীও হতে পারেন না। নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও এলাকার বাস্তব সমস্যার সঙ্গে খুব বেশি যোগাযোগ থাকে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ১২টি আসন সাধারণত ইসলামাবাদে ক্ষমতাসীন দলের দখলেই যায়। ফলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এই আসনগুলির মাধ্যমে পিওকের বিধানসভায় নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখে।
অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি, কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত কাশ্মীরিদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখার জন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তাঁরা আরও উল্লেখ করেন, ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভাতেও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের বাসিন্দাদের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে। তবে পার্থক্য হল, ভারতে সেই আসনগুলি খালি রাখা হয়; সেখানে নির্বাচন হয় না।
এত কঠোর দমন কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু নির্বাচনী সংঘাত নয়; বরং ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা নাগরিক সমাজ এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের প্রকাশ।
ভারতের গবেষক ধ্রুবজ্যোতি ভট্টাচার্যের মতে, বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া কিংবা অতীতে মাংলা বাঁধ বা বিদ্যুৎ ভর্তুকি ইস্যুতেও পাকিস্তান একই ধরনের দমননীতি অনুসরণ করেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানে ভারতের প্রাক্তন হাইকমিশনার টি.সি.এ. রাঘবন মনে করেন, এবার নিহতের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। তাঁর মতে, বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া এবং আফগানিস্তান সীমান্তে একযোগে নিরাপত্তা সংকটের কারণে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রবল চাপে রয়েছে। সেই কারণেই পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে উঠেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন?
পিওকের নির্বাচন এবার শুধু সরকার গঠনের লড়াই নয়। এটি পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা, কাশ্মীর নীতি এবং স্থানীয় মানুষের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে জমে ওঠা দীর্ঘদিনের ক্ষোভের প্রতিফলন। ১২টি সংরক্ষিত শরণার্থী আসনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন বৃহত্তর প্রশ্নে পরিণত হয়েছে—পিওকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কি সেখানকার মানুষের হাতেই থাকবে, নাকি ইসলামাবাদই সেই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে?