কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ঘিরে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, ততই সামনে আসছে প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ। এই আবহেই এক মঞ্চে উঠে এল দুই ভিন্ন বার্তা। মাইক্রোসফটের সিইও সত্য নাদেলা যেখানে মার্কিন প্রযুক্তি-ব্যবস্থার শক্তি ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর জোর দিলেন, সেখানে ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান সতর্ক করলেন—এআই দুনিয়ায় কোনও একটি সংস্থা বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য মানবজাতির জন্য মোটেও শুভ নয়।
সম্প্রতি CNN-এর ‘GPS’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিক ফারিদ জাকারিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নাদেলাকে প্রশ্ন করা হয়, চিনের নতুন প্রজন্মের এআই মডেল—বিশেষ করে Moonshot AI-এর Kimi K3—কম খরচে শক্তিশালী পরিষেবা দিতে পারছে। এতে কি মার্কিন সংস্থাগুলির আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে?
জবাবে নাদেলা বলেন, মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলির আসল শক্তি শুধু উন্নত এআই মডেল তৈরি নয়, বরং একটি বিশ্বস্ত ও পরিণত প্রযুক্তি-বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলা। তাঁর কথায়, “বিশ্বজুড়ে মানুষ আমাদের প্রযুক্তির ওপর আস্থা রাখে। সেই আস্থাই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।”
নাদেলার দাবি, চিনা এআই মডেলগুলি যতই উন্নত বা সস্তা হোক না কেন, বাস্তবে সেগুলির বড় অংশই মার্কিন ক্লাউড অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে বিশাল ডেটা সেন্টার বা হাইপারস্কেলার পরিকাঠামো এআই পরিষেবাকে চালিত করছে, তার বড় অংশই আমেরিকান প্রযুক্তি সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণে। তাই শুধু কম খরচে মডেল তৈরি করাই নেতৃত্বের একমাত্র মাপকাঠি নয়।
তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে উন্নত গবেষণার পাশাপাশি নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, ক্লাউড পরিষেবা এবং সফ্টওয়্যার ইকোসিস্টেম—সবকিছুর সমন্বয় জরুরি। আর এই কারণেই মার্কিন প্রযুক্তি শিল্প এখনও বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখার মতো অবস্থানে রয়েছে।
অল্টম্যানের সতর্কবার্তা
নাদেলার আশাবাদের মাঝেই এআই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন সুর শোনা যায় ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যানের বক্তব্যে। তাঁর স্পষ্ট মন্তব্য, “একচেটিয়া আধিপত্য খুবই খারাপ।”
অল্টম্যানের মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, শিল্প, প্রশাসন থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আগামী দিনে এআই গভীর প্রভাব ফেলবে। তাই এই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ যদি কয়েকটি সংস্থা বা একটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়, তাহলে তা উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা এবং ব্যবহারকারীদের স্বার্থ—তিনটির পক্ষেই ক্ষতিকর হবে।
তিনি বরাবরই উন্মুক্ত গবেষণা, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এবং একাধিক শক্তিশালী এআই প্ল্যাটফর্মের সহাবস্থানের পক্ষে। তাঁর মতে, প্রতিযোগিতা থাকলে প্রযুক্তির উন্নয়ন দ্রুত হয়, পরিষেবার মান বাড়ে এবং ব্যবহারকারীরা আরও বেশি বিকল্প পান।
যুক্তরাষ্ট্র বনাম চিন: লড়াই শুধু প্রযুক্তির নয়
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের নেপথ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের লড়াই। একদিকে চিনের সংস্থাগুলি তুলনামূলক কম খরচে উন্নত এআই মডেল তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলি বিপুল বিনিয়োগ করছে উন্নত জিপিইউ, ক্লাউড অবকাঠামো এবং বৃহৎ ভাষা মডেল (LLM) তৈরিতে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু কে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই তৈরি করবে, তা নিয়ে নয়। বরং কোন দেশ বা সংস্থা এমন একটি প্রযুক্তি-পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, আইনি কাঠামো এবং ব্যবহারকারীদের আস্থা সমান গুরুত্ব পাবে—সেই লড়াইটাই শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে।
সত্য নাদেলা ও স্যাম অল্টম্যানের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একদিকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে একচেটিয়া ক্ষমতার আশঙ্কা—এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই আগামী দিনের এআই বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে।