হাইলাইটস:

  • আটলান্টায় বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে মুখোমুখি ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা।
  • ফকল্যান্ড/মালভিনাস যুদ্ধের ইতিহাস ম্যাচটিকে দিয়েছে বাড়তি আবেগ।
  • ইংল্যান্ডের কাছে এটি মূলত ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আর্জেন্টিনার কাছে জাতীয় স্মৃতির অংশ।
  • লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় ঘিরে বাড়ছে উন্মাদনা।
  • ফিফাকে ঘিরে ষড়যন্ত্র তত্ত্বও নতুন করে আলোচনায়।

বাংলাস্ফিয়ার: বুধবার রাত। আটলান্টার স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপে ইতিমধ্যেই ১০১টি ম্যাচ শেষ হয়েছে, সামনে বাকি মাত্র তিনটি। এতদিনের সব উত্তেজনা, নাটক, বিস্ময় যেন এসে জমা হয়েছে এক বিন্দুতে। এবার সত্যিই মনে হচ্ছে, এই বিশ্বকাপের আসল মুহূর্ত এসে গেছে।

প্রতিটি ম্যাচ শুরুর আগে স্টেডিয়ামের লাউডস্পিকারে এক ঘোষক প্রবল উত্তেজনায় উল্টো গুনতে থাকেন—“নাইন… এইট… সেভেন…”। সেই নাটকীয় কাউন্টডাউন যেন আমেরিকান ক্রীড়া-সংস্কৃতিরই প্রতীক। অথচ মাঠে বল গড়াতেই ফুটবল আবার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যায়—শান্ত পাস, ধীর গতি, কোনও সাজানো নাটক নয়।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি আলাদা। এই ম্যাচের জন্য সেই কাউন্টডাউনও যেন যথার্থ। কারণ এটি কেবল একটি সেমিফাইনাল নয়; ইতিহাস, রাজনীতি, আবেগ এবং ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতীকগুলোর মিলনমঞ্চ।

ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা—বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াই।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে এর চেয়ে বড় ম্যাচ কি হতে পারে? আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ঐতিহ্য হয়তো বেশি সমৃদ্ধ। জার্মানি-নেদারল্যান্ডসের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও কিংবদন্তি। স্পেন-ফ্রান্স এখন প্রতিভার বিচারে সম্ভবত সবচেয়ে উঁচু মানের লড়াই।

কিন্তু আবেগ, ইতিহাস, রাজনৈতিক প্রতীক এবং সাংস্কৃতিক অভিঘাত—সব মিলিয়ে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ পর্যায়ের এক সংঘর্ষ। যেন এটি ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং ঝড় নামার আগে প্রকৃতির অদ্ভুত নীরবতা।

বিশ্বকাপের শুরু থেকেই যেন সবকিছু এই ম্যাচের দিকেই এগোচ্ছিল। এমনকি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বও সেই অনুভূতিকে আরও উসকে দিয়েছে।

ইতিহাসের ক্ষত

এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় প্রেক্ষাপট অবশ্যই ফকল্যান্ড বা মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধ।

আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে মাত্র ২৯০ মাইল দূরে, কিন্তু ব্রিটেন থেকে প্রায় ৮,০০০ মাইল দূরের এই দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে ১৯৮২ সালে যুদ্ধ হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে আশপাশে তেলের সম্ভাব্য ভাণ্ডার আবিষ্কারের পর বিষয়টি আবারও গুরুত্ব পেয়েছে।

আর্জেন্টিনার কাছে সেই যুদ্ধ এখনও জাতীয় স্মৃতির এক গভীর ক্ষত। ফুটবলেও তার প্রভাব প্রবল। ১৯৮৬ সালের ডিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল কিংবা ইংল্যান্ডকে হারানোর স্মৃতি সেই ইতিহাসেরই অংশ।

এই শত্রুতা কিন্তু সমানভাবে অনুভূত হয় না। ইংল্যান্ডের কাছে এটি প্রধানত ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু আর্জেন্টিনার কাছে ইংল্যান্ড এক ঐতিহাসিক প্রতিপক্ষ—জাতীয় পরিচয়ের অংশ।

এই ম্যাচ সেই পার্থক্যকেও নতুন করে সামনে আনবে।

দুই দলের মিল

দুই দেশের মধ্যে অদ্ভুত মিলও রয়েছে।

উভয় দেশেই ফুটবল জাতীয় আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জয়-পরাজয় সাধারণ ক্রীড়া ফলাফলের সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় গৌরবের প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

বর্তমান দুই দলও অনেকটাই একই ধরনের।

তারা নিখুঁত, সুসংগঠিত দল নয়; বরং প্রতিভাবান তারকাদের ব্যক্তিগত জাদু, নাটকীয় প্রত্যাবর্তন এবং আবেগের জোরে এতদূর এসেছে।

তাই আটলান্টার এই লড়াইও যুক্তির চেয়ে আবেগের ম্যাচ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ইংল্যান্ড আগের দুই ম্যাচেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চাপে ছিল।

আর্জেন্টিনার দলে আবার এমন কয়েকজন ফুটবলার আছেন, যারা প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে চাপে ফেলতে ও সংঘর্ষে জড়াতে ওস্তাদ।

ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (VAR) বিতর্ক? ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর সঙ্গে প্রথম মিনিটেই সংঘর্ষ? কিংবা টাইব্রেকারে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ?

সবকিছুই সম্ভব।

শেষ অধ্যায়ের নায়ক

এই ম্যাচের আরেকটি বড় গল্প লিওনেল মেসি।

সম্ভবত সর্বকালের সেরা ফুটবলারের আন্তর্জাতিক জীবনের শেষ বিশ্বকাপ এটি। ফলে বিশ্বজুড়ে তাকে ঘিরে এক ধরনের পূজার আবহ তৈরি হয়েছে।

অনেকে মনে করেন, মেসির মতো খেলোয়াড় এমন ম্যাচ হারতেই পারেন না। বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে।

কিন্তু বাস্তবতা হল, সব কিছুরই শেষ আছে।

মেসির প্রতি আর্জেন্টিনার ভালোবাসা অনেক সময় যুক্তির সীমাও ছাড়িয়ে যায়। সতীর্থরা ড্রেসিংরুমে তাকে গান শোনায়। গোটা দেশ তার জার্সি পরে রাস্তায় নামে।

মনে হয়, আর্জেন্টিনা যেন শুধু দেশের জন্য নয়, মেসির জন্যও খেলছে।

লেখকের মতে, এটি অনেকটা সেই ধারণার মতো, যাকে ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েল বলেছিলেন ‘ইমোশনাল ন্যাশনালিজম’—অর্থাৎ ব্যক্তি বা জাতিকে ঘিরে আবেগের এমন বিস্তার, যা যুক্তিকে ছাপিয়ে যায়।

ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন

তবু একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

৩৯ বছর বয়সেও মেসি যেভাবে খেলছেন, তা প্রায় অবিশ্বাস্য।

বিশ্বকাপে তাকে যতদিন রাখা যায়, ততদিন দর্শকসংখ্যা, টেলিভিশন রেটিং এবং বাণিজ্যিক আয়ও বাড়বে।

এই কারণেই সামাজিক মাধ্যমে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ঘুরছে—ফিফা নাকি চায় মেসি আরও এগিয়ে যান।

ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা—দুই দলই টুর্নামেন্টে কিছু বিতর্কিত রেফারিং সিদ্ধান্তের সুবিধা পেয়েছে, আবার ক্ষতিও হয়েছে।

তবু সন্দেহ পুরোপুরি থামছে না।

কারণ ফুটবলের এই যুগে মেসি শুধু একজন খেলোয়াড় নন—তিনি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড এবং কোটি কোটি মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।