ষাটে ‘পেঙ্গুইন ওয়াক’ কেন?

যা জানা জরুরি
- ষাটের পরে কোনও কোনও মহিলার হাঁটার মধ্যে এমন দুলুনি দেখা গেলেও তাকে শুধু বার্ধক্যের স্বাভাবিক লক্ষণ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
- নিতম্বের পেশি দুর্বল হয়ে পড়া, অস্থিসন্ধির সমস্যা থেকে শুরু করে স্নায়ুর অসুখ—বদলে যাওয়া হাঁটার নেপথ্যে থাকতে পারে নানা কারণ।
- সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন ফিজিয়োথেরাপিস্ট আকাশ সিংহ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বয়স বাড়লেই কি হাঁটার সময় দু’দিকে দুলতে হবে? একেবারেই নয়। ষাটের পরে কোনও কোনও মহিলার হাঁটার মধ্যে এমন দুলুনি দেখা গেলেও তাকে শুধু বার্ধক্যের স্বাভাবিক লক্ষণ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। নিতম্বের পেশি দুর্বল হয়ে পড়া, অস্থিসন্ধির সমস্যা থেকে শুরু করে স্নায়ুর অসুখ—বদলে যাওয়া হাঁটার নেপথ্যে থাকতে পারে নানা কারণ।
সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন ফিজিয়োথেরাপিস্ট আকাশ সিংহ। হাঁটার সময় শরীরের এক পাশ থেকে অন্য পাশে দুলে যাওয়ার এই ধরনকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ওয়াডলিং গেইট’ বা দুলে দুলে হাঁটা। নিতম্বের পেশি, বিশেষ করে ‘গ্লুটিয়াস মিডিয়াস’, দুর্বল হয়ে পড়লে এমনটা হতে পারে। একই ভাবে ঊরু সামনের দিকে তুলতে সাহায্যকারী পেশির দুর্বলতাও হাঁটার ধরন বদলে দিতে পারে।
আকাশের ভাষায়, “ষাটের পরে এত ভারতীয় মা কেন পেঙ্গুইনের মতো হাঁটতে শুরু করেন?”
এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি জানান, হাঁটার সময় প্রতিটি পদক্ষেপে কিছুক্ষণের জন্য শরীরের পুরো ভার একটি পায়ের উপর চলে আসে। তখন শ্রোণি বা কোমরের নীচের অংশের হাড়ের কাঠামো স্থির রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় গ্লুটিয়াস মিডিয়াস পেশি। সেটি দুর্বল হলে শ্রোণির এক পাশ নীচের দিকে নেমে যেতে পারে। ভারসাম্য ধরে রাখতে শরীর তখন বিপরীত দিকে হেলে পড়ে। আর সেখান থেকেই হাঁটার মধ্যে আসে দুলুনি।
ঊরু তোলার পেশিগুলিও দুর্বল হলে পা সামনের দিকে তোলা কঠিন হয়। ফলে হাঁটাচলা আরও ধীর ও কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে।
আকাশের কথায়, “সমস্যা শুধু হাঁটাতেই থেমে থাকে না।” নিতম্ব ও শ্রোণির নিয়ন্ত্রণ কমে গেলে ভারসাম্য বজায় রাখতে কোমরের নীচের অংশে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। এর সঙ্গে কোমরব্যথা, হাঁটুর অস্থিরতা, অস্থিসন্ধিতে বাড়তি চাপ, ভারসাম্যের সমস্যা এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও জড়িত থাকতে পারে।
শুধু বয়সের দোষ নয়
পিএসআরআই হাসপাতালের ক্রীড়াজনিত আঘাত, অস্থিসন্ধি সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপন শল্যচিকিৎসা বিভাগের অধিকর্তা এবং প্রবীণ পরামর্শদাতা চিকিৎসক গৌরব প্রকাশ ভরদ্বাজের মতে, বয়স বাড়লে হাঁটার গতি কমতে পারে, ভারসাম্যের ক্ষমতা কিছুটা কমতে পারে এবং পেশির শক্তিও হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু স্পষ্ট ভাবে পাশ থেকে পাশে দুলে হাঁটাকে বার্ধক্যের অবধারিত পরিণতি বলা যায় না।
তাঁর কথায়, “হাঁটার সময়ে লক্ষণীয় ভাবে পাশ থেকে পাশে দুলে ওঠা নিতম্ব ও শ্রোণির পেশি, বিশেষ করে নিতম্বের গ্লুটিয়াল পেশিগুলির দুর্বলতার লক্ষণ হতে পারে।”
শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়া, পুরনো চোট কিংবা অন্য কোনও অসুখও হাঁটার ধরন বদলে দিতে পারে। তাই আগে স্বাভাবিক ভাবে হাঁটলেও হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে শুধু বয়সের প্রভাব বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
নেপথ্যে থাকতে পারে কী?
নিতম্ব ও শ্রোণির আশপাশের পেশির দুর্বলতা অবশ্যই একটি সম্ভাব্য কারণ। কিন্তু এর বাইরেও রয়েছে বেশ কিছু সম্ভাবনা।
ভরদ্বাজের মতে, নিতম্বের অস্থিসন্ধিতে বাত বা অন্য কোনও সমস্যা, মেরুদণ্ডের অসুখ, স্নায়ুতন্ত্রের রোগ, পেশির সমস্যা কিংবা স্নায়ুর অসুখ—সবই হাঁটার ধরন বদলে দিতে পারে।
এ ছাড়া নিতম্ব বা পায়ে ব্যথা, আড়ষ্টতা কিংবা দুর্বলতার কারণেও হাঁটার ভঙ্গি পাল্টাতে পারে। তাই বয়সকে দায়ী করার আগে দেখতে হবে, ঠিক কী পরিবর্তন হয়েছে এবং তার সঙ্গে অন্য কোনও উপসর্গ রয়েছে কি না।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
দুলে দুলে হাঁটা নতুন করে শুরু হলে বা সময়ের সঙ্গে তা বাড়তে থাকলে চিকিৎসক কিংবা ফিজিয়োথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভাল। বিশেষ করে হাঁটার সঙ্গে ব্যথা থাকলে বা বারবার পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অবশ ভাব, পায়ে দুর্বলতা, সিঁড়ি ভাঙতে সমস্যা কিংবা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেও অসুবিধা হলে দ্রুত মূল্যায়ন করানো উচিত।
ভরদ্বাজের কথায়, “গোড়াতেই মূল্যায়ন করা হলে কারণ চিহ্নিত করা যায় এবং চলাফেরার ক্ষমতা আরও কমে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।”
লক্ষ্য শুধু হাঁটার ভঙ্গি সুন্দর করা নয়। এর পিছনে অস্থিসন্ধি, পেশি, স্নায়ু কিংবা ভারসাম্যের কোনও সমস্যা রয়েছে কি না, সেটি খুঁজে বের করাও সমান জরুরি।
হাঁটা মজবুত রাখতে কী করবেন?
পঞ্চাশ-ষাটের কোঠায় নিয়মিত কিছু সহজ ব্যায়াম পেশি ও ভারসাম্য ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। ভরদ্বাজের পরামর্শের মধ্যে রয়েছে—
- চেয়ার থেকে ওঠাবসা: পা ও নিতম্বের পেশি শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
- গোড়ালি তুলে দাঁড়ানো: পায়ের নীচের অংশের পেশির শক্তি বজায় রাখতে সহায়ক।
- পাশের দিকে পা তোলা: নিতম্বের আশপাশের পেশিকে সক্রিয় করে।
- ধাপে ওঠানামা: পায়ের শক্তি এবং দৈনন্দিন চলাফেরার সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
- অবলম্বন ধরে এক পায়ে দাঁড়ানো: ভারসাম্যের অনুশীলন হিসেবে কাজে লাগে।
- হাঁটা ও নড়াচড়ার ব্যায়াম: চলনক্ষমতা ও নমনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ভরদ্বাজের মতে, সপ্তাহে অন্তত দু’দিন পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম, নিয়মিত হাঁটা এবং খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন পেশির পরিমাণ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে ব্যায়াম শুরু করতে হবে ধীরে। অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা কিংবা ভারসাম্যের সমস্যা থাকলে সবার জন্য একই ব্যায়াম উপযুক্ত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা বদলাতে হবে।
ষাট পেরোলেই হাঁটায় ‘পেঙ্গুইন ওয়াক’ আসবে—এমন ধারণা তাই ভুল। শরীরের দেওয়া এই সংকেতকে বয়সের ঘাড়ে চাপিয়ে না দিয়ে সময়মতো কারণটা খুঁজে বের করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদন সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। কোনও নতুন ব্যায়াম বা শরীরচর্চা শুরু করার আগে নিজের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।



