বাংলাস্ফিয়ার: কৃষক আন্দোলন, মণিপুর, সংরক্ষণ, সমকামীদের অধিকার থেকে সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব বিক্ষোভ—নরেন্দ্র মোদী সরকারের অবস্থান বা রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, তাঁর মন্তব্যের পরে অবস্থান নরম করেছে বিজেপি বা সরকার। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ধাক্কার পর সেই ‘সতর্কবার্তা’র রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

ভারতের শাসক দল বিজেপি এবং তার আদর্শগত অভিভাবক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সম্পর্ককে শুধু ‘নির্দেশদাতা’ ও ‘নির্দেশগ্রহীতা’র সরল সমীকরণে ব্যাখ্যা করা কঠিন। সঙ্ঘ বরাবরই বলে এসেছে, বিজেপি একটি স্বাধীন রাজনৈতিক দল, সরকার পরিচালনার সিদ্ধান্তও তার নিজের। কিন্তু গত কয়েক বছরে বারবার এমন মুহূর্ত এসেছে, যখন মোহন ভাগবতের প্রকাশ্য মন্তব্যকে বিজেপি নেতৃত্বের উদ্দেশে সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হয়েছে। কখনও নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরে, কখনও সামাজিক অসন্তোষের মুখে, কখনও আবার এমন কোনও বিষয়ে যেখানে সরকারের কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক জেন জি-র ছাত্র আন্দোলনের পর সেই পুরনো ছবিটিই নতুন করে সামনে এসেছে। ভাগবত বলেছেন, প্রতিবাদী তরুণদের ‘দেশবিরোধী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তাঁর বক্তব্য, জেন জি এবং জেন আলফা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি সৎ; তাদের মধ্যে দেশপ্রেমের আন্তরিক অনুভূতি রয়েছে। প্রতিবাদও গণতান্ত্রিক কথোপকথনের একটি বৈধ মাধ্যম। তরুণদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে যুক্তি, স্নেহ এবং আপনত্বের বোধ দিয়ে।

এই মন্তব্যের তাৎপর্য বেড়েছে তার সময়ের কারণে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন কয়েক সপ্তাহ ধরে কেন্দ্রকে প্রবল চাপে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা, পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারের একাধিক পদক্ষেপের পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। বিজেপির ভিতরেও পরে স্বীকার করা হয়, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করায় পরিস্থিতি অকারণে জটিল হয়েছে এবং সরকারের ভাবমূর্তিতে আঁচ পড়েছে।

২০২৪-এই প্রকাশ্যে এসেছিল দূরত্ব

তবে ভাগবতের এই ভূমিকা নতুন নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নজির ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ২৪০ আসনে নেমে আসার পরে নাগপুরে ভাগবত বলেছিলেন, প্রকৃত ‘সেবক’-এর অহঙ্কার থাকে না। নির্বাচনী প্রচারে ‘মর্যাদা’ রক্ষা করা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই বক্তৃতায় মণিপুরের দীর্ঘস্থায়ী হিংসা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, সেখানে শান্তি ফেরানোর দিকে কে নজর দেবে?

সঙ্ঘের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সাধারণত বিজেপি নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে এ ভাবে সমালোচনা করে না। ফলে মন্তব্যগুলি নিছক নৈতিক উপদেশ হিসেবে দেখা হয়নি। বিজেপির মধ্যেও তখন স্বীকার করা হয়েছিল যে সঙ্ঘের সঙ্গে যোগাযোগে সমস্যা তৈরি হয়েছিল এবং প্রার্থী নির্বাচন-সহ বিভিন্ন বিষয়ে নিচুতলার প্রতিক্রিয়াকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

এর পটভূমিতে ছিল বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডার সেই বহুচর্চিত মন্তব্য—বিজেপি এখন নিজেই যথেষ্ট শক্তিশালী, আগের মতো আরএসএসের ‘হাত ধরে’ চলার প্রয়োজন নেই। ২০২৪-এর ফলের পরে সেই আত্মবিশ্বাসের মূল্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তী সময়ে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা এবং দিল্লির মতো নির্বাচনে বিজেপি ও সঙ্ঘের সমন্বয় আবার দৃঢ় হয়। ২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদীর নাগপুরে সঙ্ঘ সদর দফতর সফর সেই সম্পর্ক মেরামতের প্রকাশ্য প্রতীক হয়ে ওঠে।

সংরক্ষণেও বদলেছে সুর

সঙ্ঘের হস্তক্ষেপের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র সংরক্ষণ। ২০১৫ সালে ভাগবত সংরক্ষণ নীতি পর্যালোচনার কথা বলার পরে বিরোধীরা তা রাজনৈতিক অস্ত্র করে তোলে। বিহারের নির্বাচনে বিজেপির ক্ষতির সঙ্গে সেই বিতর্কের সম্পর্ক রয়েছে বলেও সঙ্ঘ-বিজেপির একাংশ মনে করেছিল।

তার পরে ভাগবতের বক্তব্যে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৩ সালে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, ভারতীয় সমাজে প্রায় দু’হাজার বছর ধরে বৈষম্য চলে এসেছে এবং যত দিন সেই বৈষম্য থাকবে, তত দিন সাংবিধানিক সংরক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে। সঙ্ঘ সংরক্ষণকে সম্পূর্ণ সমর্থন করে বলেও জানান তিনি। অর্থাৎ সামাজিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বুঝে পুরনো অবস্থান সংশোধনের নজির সঙ্ঘের মধ্যেই রয়েছে।

২০২৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সমতা-বিধি নিয়েও উচ্চবর্ণ ও দলিতদের পাল্টাপাল্টি আন্দোলনের মধ্যে সঙ্ঘ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে। তার প্রধান উদ্বেগ ছিল সামাজিক বিভাজন যাতে আরও না বাড়ে।

সমকামীদের নিয়েও তুলনায় নরম বার্তা

সামাজিক প্রশ্নেও ভাগবত কখনও কখনও বিজেপি-সমর্থক রক্ষণশীল পরিসরের তুলনায় আলাদা ভাষা ব্যবহার করেছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, এলজিবিটিকিউ মানুষ সমাজেরই অংশ এবং তাঁদের হেয় করা উচিত নয়। একই বক্তৃতায় অবশ্য তিনি ‘লিভ-ইন’ সম্পর্কের সমালোচনা করে তাকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ বলেছেন। অর্থাৎ সঙ্ঘের মৌলিক সামাজিক রক্ষণশীলতা বজায় রেখেও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সামাজিক পরিসরের বাইরে ঠেলে না দেওয়ার চেষ্টা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট।

কৃষক আন্দোলন থেকে শিক্ষা

কৃষক আন্দোলনও মোদী সরকারের জন্য একই ধরনের রাজনৈতিক শিক্ষা তৈরি করেছিল। তিন কৃষি আইন নিয়ে দীর্ঘ আন্দোলনের সময়ে প্রথম দিকে সরকার অনড় থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে আইনগুলি প্রত্যাহার করতে হয়। সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সেই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে—দুই ক্ষেত্রেই আন্দোলন এমন সামাজিক অংশের মধ্যে ছড়িয়েছিল, যাদের বড় অংশকে বিজেপি নিজের সম্ভাব্য বা বাস্তব সমর্থক বলে মনে করে।

সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন সম্পর্কে বিজেপির উদ্বেগ আরও বেশি হওয়ার কারণও সেটিই। আন্দোলনটি কোনও একটি প্রতিষ্ঠিত বিরোধী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে ছিল না; সামাজিক মাধ্যম, মিম, রিল এবং বিকেন্দ্রীভূত সংগঠনের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে আন্দোলনের নেতৃত্বকে আক্রমণ বা কোনও একটি রাজনৈতিক পরিচয়ে বেঁধে দিয়ে তাকে দুর্বল করার পরিচিত কৌশল পুরোপুরি কাজে লাগেনি।

জেন জি কেন আলাদা চ্যালেঞ্জ

ভারতের রাজনীতিতে জেন জি এখন বিশাল ভোটারগোষ্ঠী। ২০২৬-এর বিভিন্ন নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণেও দেখা গিয়েছে, চাকরি, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা তরুণ ভোটারদের কাছে ক্রমশ বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে। শুধু পরিচয়ের রাজনীতি বা কল্যাণমূলক প্রকল্প দিয়ে তাদের প্রত্যাশা মেটানো যাচ্ছে না।

সেই কারণেই ছাত্র আন্দোলনের পরে বিজেপির রাজনৈতিক যোগাযোগেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী ও তাঁর সরকারের তরুণদের কাছে পৌঁছনোর প্রচারে ইনস্টাগ্রাম, ছোট ভিডিও, তুলনায় অনানুষ্ঠানিক ভাষা এবং কম সম্পাদিত বিষয়বস্তুর ব্যবহার বেড়েছে। প্রায় ৪০ কোটি সম্ভাব্য জেন জি ভোটারের কথা মাথায় রেখে ২০২৯-এর আগেই এই নতুন যোগাযোগ-কৌশল গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

কিন্তু ভাগবতের বার্তা শুধু যোগাযোগের কৌশল বদলানোর নয়। তাঁর বক্তব্যের মূল রাজনৈতিক তাৎপর্য—প্রতিবাদকে শত্রুতা হিসেবে দেখলে তরুণদের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়বে।

এখানেই ২০২৪ এবং ২০২৬ যেন একই সূত্রে বাঁধা। ২০২৪-এর ফলের পরে ভাগবতের বার্তা ছিল অহঙ্কার পরিহার, বিরোধীদের শত্রু না ভাবা, ঐকমত্য এবং নিচুতলার বাস্তবতা শোনা। ২০২৬-এর ছাত্র আন্দোলনের পরে তাঁর বার্তা—তরুণ প্রতিবাদীদের ‘দেশবিরোধী’ না বলে তাদের প্রশ্ন শুনতে হবে।

বিজেপি ও সঙ্ঘের মধ্যে মতপার্থক্য তাই বিচ্ছেদের লক্ষণ নয়। বরং সঙ্ঘের ঐতিহাসিক ভূমিকার একটি দিক এখানে স্পষ্ট—ক্ষমতায় থাকা বিজেপি যখন প্রশাসনিক যুক্তি বা নির্বাচনী আত্মবিশ্বাসের কারণে সামাজিক অসন্তোষের সংকেত ধরতে দেরি করে, তখন সঙ্ঘ নিজের বিস্তৃত সাংগঠনিক জালের প্রতিক্রিয়া সামনে এনে সতর্ক করে।

২০২৪-এর নির্বাচনী ধাক্কা বিজেপিকে সেই বাস্তবতা মনে করিয়ে দিয়েছিল। ২০২৬-এর জেন জি আন্দোলন আবার একই শিক্ষা সামনে এনেছে—নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিক শক্তি দেয়, কিন্তু সামাজিক অসন্তোষকে অস্বীকার করার ক্ষমতা দেয় না। আর মোহন ভাগবতের সাম্প্রতিক বার্তা বলছে, সঙ্ঘ অন্তত সেই পার্থক্যটি বিজেপিকে বারবার মনে করিয়ে দিতে চায়।