বাংলাস্ফিয়ার: ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে ছাত্র-চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের জট কাটল না। শনিবার রাজ্য সরকারের মন্ত্রীদের বিশেষ কমিটির সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দ্বিতীয় দফার আলোচনা হলেও কোনও চূড়ান্ত সমাধানসূত্র বেরোয়নি। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তাঁদের দাবিগুলি মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের কাছে পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের তরফে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ও লিখিত নির্দেশ না আসা পর্যন্ত অনশন ও আন্দোলন প্রত্যাহারের প্রশ্ন নেই।
ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ১৪তম সম্মিলিত সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষাকে কেন্দ্র করেই বর্তমান আন্দোলনের সূত্রপাত। গত ২ জুলাই প্রাথমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে জেপিএসসি। ১০৩টি শূন্যপদের জন্য ২,২০৪ জনকে পরবর্তী পর্যায়ের জন্য বাছাই করা হয়। পরীক্ষার্থী ছিলেন প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ। ফল ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস-সহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠতে থাকে। ইতিমধ্যে তদন্তে ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীও জানিয়েছেন, সরকার চাকরিপ্রার্থীদের পাশে রয়েছে। কিন্তু তাতেও ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি।
শনিবার সকালে জেপিএসসি-জেএসএসসি অভ্যর্থী ন্যায় মঞ্চের আট সদস্যের প্রতিনিধি দল রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামের আন্দোলনস্থল থেকে মোরাবাদির সরকারি অতিথিশালায় যায়। সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ বৈঠক শুরু হয়। সরকারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার সুদিব্য কুমার সোনু ও চামরা লিন্ডা, কংগ্রেসের দীপিকা সিং পাণ্ডে এবং আরজেডির সঞ্জয় যাদব।
এর আগের রাতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছিল আন্দোলনকারীদের আর একটি মঞ্চ—জেপিএসসি-জেএসএসসি রিফর্ম মঞ্চ। শনিবারের বৈঠকে মূলত সেই দাবিগুলিই আবার তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি টিজিটি এবং অন্যান্য শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা সংক্রান্ত অভিযোগও সরকারের সামনে রাখা হয়।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে ১৪তম জেপিএসসি পরীক্ষা বাতিল, অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং নিয়োগ পরীক্ষার ব্যবস্থায় সার্বিক সংস্কার। আন্দোলনকারীদের একাংশ তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে দেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আদালত গঠনের দাবিও তুলেছে। জেপিএসসির যে আধিকারিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করার দাবিও জানানো হয়েছে।
বৈঠকের পরে মন্ত্রী সুদিব্য কুমার সোনু জানান, সরকার পরীক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত সংগ্রহ করতে একটি বিশেষ ই-মেল ঠিকানা চালু করছে। নিয়োগ পরীক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের জন্য সেই পরামর্শগুলি বিবেচনা করা হবে। সরকার বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে বলেও তিনি জানান। শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের নেতৃত্বেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে এই আশ্বাসে এখনই আন্দোলন প্রত্যাহার করতে নারাজ চাকরিপ্রার্থীরা। ছাত্র প্রতিনিধি চন্দন রজক স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁদের দাবিগুলি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাবে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অনশন বা আন্দোলন থেকে তাঁরা সরে যাবেন না। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, মৌখিক আশ্বাস নয়—তাঁরা সরকারের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত চান।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোর বক্তব্য, ১৪তম জেপিএসসি সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষা অবিলম্বে বাতিল করাই তাঁদের প্রধান দাবি। তাঁর প্রশ্ন, আগের দফার আলোচনাতেই যদি সরকার দাবিগুলি মেনে নিত, তা হলে দ্বিতীয় বৈঠকের প্রয়োজন পড়ত না। দুই মঞ্চের মূল দাবির মধ্যে কার্যত কোনও বড় পার্থক্য নেই বলেও তাঁর দাবি।
এ দিকে আন্দোলন যত দীর্ঘ হচ্ছে, অনশনকারীদের শারীরিক অবস্থাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। শনিবার দুই অনশনকারীর স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় তাঁদের সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আরও কয়েক জন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তা সত্ত্বেও জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে আন্দোলনকারীদের ভিড় বাড়ছে।
আন্দোলনে এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনও সক্রিয় হয়েছে। এবিভিপির কর্মীদের সঙ্গে শুক্রবার পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। আইসা রাঁচিতে মিছিল করেছে। শাসক জেএমএমের ছাত্র সংগঠন ঝাড়খণ্ড ছাত্র মোর্চাও ১৪তম জেপিএসসি পরীক্ষা বাতিল-সহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এনএসইউআইয়ের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে সন্দেহের আওতায় থাকা জেপিএসসি ও জেএসএসসি পরীক্ষাগুলির ৯০ দিনের মধ্যে সিআইডি তদন্ত এবং জাতীয় পরীক্ষামূলক সংস্থার আদলে ‘ঝাড়খণ্ড টেস্টিং এজেন্সি’ গঠন। আদিবাসী ছাত্র সংগঠনগুলি আবার নিয়োগ পরীক্ষায় আদিবাসী ও আঞ্চলিক ভাষাকে যোগ্যতা নির্ধারক পত্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।
এর মধ্যেই সিআইডি তদন্তের গতি বাড়িয়েছে। পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের তদন্তে কমিশনের তিন কর্মরত সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে। অন্য দিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবী প্রশ্ন তুলেছেন, কালো তালিকাভুক্ত সংস্থাকে দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হল কেন। এই ইস্যুতে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছেন।
ফলে সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু হলেও সঙ্কটের রাজনৈতিক চাপ কমছে না। বরং আন্দোলনকারীরা ইতিমধ্যেই ১০ অগস্ট ঝাড়খণ্ড বিধানসভা অভিমুখে মিছিল ও ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। তার আগে মুখ্যমন্ত্রী কোনও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন কি না, এখন সেদিকেই নজর। দ্বিতীয় দফার আলোচনার পরে অন্তত এটুকু স্পষ্ট—কেবল আলোচনার আশ্বাসে আর আন্দোলন থামাতে রাজি নন চাকরিপ্রার্থীরা; তাঁরা চাইছেন দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ।