দশ বছরে এক লক্ষ কোটি, এখনই চার হাজার কোটি: আদানি ঘোষণার অঙ্ক

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: আদানি গোষ্ঠী ২০৩৫ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
- ২৪ সেপ্টেম্বর নিউ টাউনে দু’হাজার শয্যার বহুবিশেষজ্ঞ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি এই সময়সীমা ও অঙ্ক জানান।
- সম্ভাব্য ক্ষেত্রের তালিকায় বন্দর, পণ্য পরিবহণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বণ্টন, সড়ক, সেতু, রোপওয়ে, পরিবেশবান্ধব সিমেন্ট এবং বৃহৎ তথ্যকেন্দ্র রয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: আদানি গোষ্ঠী ২০৩৫ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর নিউ টাউনে দু’হাজার শয্যার বহুবিশেষজ্ঞ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি এই সময়সীমা ও অঙ্ক জানান। সম্ভাব্য ক্ষেত্রের তালিকায় বন্দর, পণ্য পরিবহণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বণ্টন, সড়ক, সেতু, রোপওয়ে, পরিবেশবান্ধব সিমেন্ট এবং বৃহৎ তথ্যকেন্দ্র রয়েছে। এটি বিনিয়োগের ঘোষিত পরিকল্পনা; এক লক্ষ কোটি টাকা ইতিমধ্যে খরচ বা চুক্তিবদ্ধ হয়েছে, ডটএমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
তাৎক্ষণিক নির্দিষ্ট প্রকল্পটি ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’। গোষ্ঠীর বিবৃতি অনুযায়ী, ৫১.৭৫ একর জমিতে হাসপাতাল, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্র মিলিয়ে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। বছরে দু’লক্ষের বেশি ভর্তি রোগী এবং বিশ লক্ষের বেশি বহির্বিভাগের রোগীকে পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। প্রায় দশ হাজার কাজ তৈরির দাবিও করা হয়েছে। তবে নির্মাণের ধাপ, চালুর বছর, স্থায়ী ও অস্থায়ী কাজের ভাগ এবং চিকিৎসক-নার্সের নিয়োগপদ্ধতির পূর্ণ নথি এখনও জনসমক্ষে নেই।
দু’হাজার শয্যার অর্ধেক অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রোগীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে চিকিৎসা দেওয়া হবে বলে আদানি জানিয়েছেন। ‘লাভবিহীন’ হাসপাতাল কথাটির বাস্তব অর্থ বুঝতে শয্যাভাড়া, পরীক্ষা, ওষুধ, চিকিৎসকের পারিশ্রমিক এবং বিমার বাইরে থাকা খরচ প্রকাশ করা প্রয়োজন। সংরক্ষিত শয্যা খালি থাকলে কীভাবে বরাদ্দ হবে এবং রোগীর যোগ্যতা কোন নথিতে যাচাই হবে, সেটিও পরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বৃহত্তর বিনিয়োগ ঘোষণাটি নতুন বিজেপি সরকারের শিল্পনীতি প্রদর্শনের অংশ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দু’দিন আগে মুম্বইয়ে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানির সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে কথা বলেছেন। রাজ্য সরকার অনুমোদন দ্রুত করা, জমি বরাদ্দ এবং শিল্পের বাধা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। একই সঙ্গে একটি গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি ঘোষণা ও রাজ্যের বাস্তব মোট বিনিয়োগ আলাদা হিসাব, দুটি জুড়ে শিল্পায়নের সাফল্য ঘোষণা করা যাবে না।
আদানি ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিং সংস্কার, কুমোরটুলি ঘাট পুনরুজ্জীবন এবং দুর্গাপুজোর শিল্পকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার উদ্যোগে সহায়তার কথাও বলেছেন। এগুলি কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্বের সম্ভাব্য কাজ; চূড়ান্ত চুক্তি, বাজেট ও দায়িত্ববণ্টন প্রকাশ না-হওয়া পর্যন্ত সরকারি প্রকল্প হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ঐতিহ্য সংরক্ষণে বেসরকারি অর্থ এলেও প্রত্নমূল্য, দরপত্র এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিয়ম সরকারেরই নির্ধারণ করা উচিত।
দশ বছরের মোট পরিকল্পনায় সরকারের দেওয়া জমি, কর-সুবিধা, বিদ্যুৎ বা সড়ক সহায়তার আর্থিক মূল্যও প্রকাশ করা উচিত। সরকারি সহায়তা নিজে থেকে অনিয়ম নয়; বড় প্রকল্পে তা সাধারণ চর্চা। কিন্তু বিনিময়ে কত মূলধন সত্যিই এল, কত স্থানীয় কর্মী নিয়োগ হল এবং ঘোষিত সময় না-মানলে কী হবে, চুক্তির এই অংশগুলি গোপন থাকলে জনসাধারণ লাভ-খরচ তুলনা করতে পারবেন না। হাসপাতালের ক্ষেত্রেও জমির মূল্য ও ছাড় মোট চার হাজার কোটির বেসরকারি ব্যয়ের বাইরে আলাদা হিসাব।
বিশ্লেষণ: এক লক্ষ কোটি টাকার শিরোনাম বড়, কিন্তু শিল্পায়নের বিশ্বাসযোগ্য মাপকাঠি হবে বছরভিত্তিক মূলধন খরচ, জমিতে কাজ, উৎপাদন শুরু, স্থানীয় সরবরাহকারীর অংশ এবং স্থায়ী কর্মসংস্থান। বন্দর বা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি ও পরিবেশ ছাড়পত্র যেমন সময় নেয়, তথ্যকেন্দ্রের জন্য বিদ্যুৎ ও জলও লাগে। তাই প্রতিটি খাতের স্থান, ক্ষমতা ও সময়সীমা ছাড়া মোট অঙ্ক ভবিষ্যৎ ইচ্ছার হিসাবই থাকে।
হাসপাতালটি তুলনায় যাচাইযোগ্য প্রথম পরীক্ষা। নির্মাণের অগ্রগতি, শয্যা চালুর ধাপ, দরিদ্র রোগীর কোটা এবং চাকরির সংখ্যা নিয়মিত প্রকাশ করলে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবের দূরত্ব বোঝা যাবে। বড় সংস্থাকে স্বাগত জানানো এবং করছাড়, জমি বা পরিকাঠামোর বিনিময়ে জনস্বার্থের শর্ত প্রকাশ, দুই কাজ একসঙ্গে করা যায়। বাংলার শিল্পনীতির সাফল্য কোনও শিল্পপতির প্রশংসাবাক্যে নয়, সম্পন্ন প্রকল্প ও নাগরিকের প্রাপ্তিতে নির্ধারিত হবে। প্রতি অর্থবর্ষের বাস্তব অগ্রগতি তাই আলাদা করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



