বাংলাস্ফিয়ার: খননযন্ত্রটি হঠাৎ থেমে গেল। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে এক শ্রমিক টেনে বার করলেন একটি জিনিস। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ধাতব টুকরো নয়, ভাঙা কংক্রিটও নয়। সেটি একটি শিশুর খাতা।
পাতাগুলি এখনও অক্ষত। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা পড়া যাচ্ছে। খাতার সামনে লেখা একটি নাম—মাহিয়া সালারি। বয়স ছিল মাত্র আট বছর।
দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পাঁচ মাস পরেও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শেষ হয়নি। খননযন্ত্র এখনও মাটি আর কংক্রিট সরিয়ে চলেছে। কারণ, এক বালকের দেহাবশেষ এখনও এই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মিনাবের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিন এই স্কুলে মার্কিন নির্মিত টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর ১৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১২০ জনই শিশু।
এখন গোটা মিনাব শহর জুড়ে মৃতদের ছবি। দেওয়ালে, দোকানের সামনে, রাস্তার ধারের বিশাল ফলকে—সর্বত্র নিহতদের মুখ। যুদ্ধের অসামরিক শিকারদের যন্ত্রণার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে এই শহর।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের আক্রমণ শুরু হওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “নিজেদের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিন।”
কিন্তু তার পরের ঘটনাপ্রবাহ ইরানকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যা হয়তো অনেকেই কল্পনা করেননি। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভ্রমণ করলে বোঝা যায়, এই যুদ্ধ ইরানের মানুষের জীবন, রাজনীতি এবং মনোজগতে কত গভীর ছাপ ফেলেছে।
তেহরান থেকে বন্দর আব্বাস পর্যন্ত রাতের ট্রেনের যাত্রাপথ প্রায় ১,৪৪৮ কিলোমিটার। ইরানের রাজনৈতিক প্রাণকেন্দ্রকে এই রেলপথ যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালীর তীরে দেশের কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ উপকূলের সঙ্গে। পাহাড় ও মরুভূমি পেরিয়ে, নাতাঞ্জ ও ফোরদোর পরমাণু কেন্দ্রের পাশ দিয়ে ট্রেন পৌঁছয় পারস্য উপসাগরের কাছে।
ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রছাত্রী, ফুটবলার, ব্যবসায়ী, পরিবার নিয়ে সফররত মানুষ। ইরানের নানা প্রান্তের মানুষ। আর প্রত্যেকের কাছেই এই যুদ্ধের অর্থ যেন আলাদা।
বছরের শুরুতে ইরানের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম। বছরের পর বছর ধরে চলা কঠোর নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক দুর্দশা, লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের নেতৃত্বের প্রতি ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের জেরে সরকারবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
সেই আন্দোলনের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান চালানো হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, সেই দমন অভিযানে কয়েক হাজার নয়, কয়েক দশ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, আরও বহু মানুষ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন। যদিও প্রকৃত মৃতের সংখ্যা নিয়ে এখনও প্রবল বিতর্ক রয়েছে।
তার পরেই এল যুদ্ধ।
আজাদেহ পেশায় আইনজীবী। তাঁর কথায়, যুদ্ধের প্রথম কয়েকটি দিন ছিল আতঙ্কে ভরা।
তিনি বলেন, “পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যেন প্রত্যেক ইরানির স্বভাবের মধ্যেই রয়েছে। আমরা আমাদের জীবন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। দৈনন্দিন অভ্যাসগুলি যতটা সম্ভব বজায় রেখেছি। আশা ছাড়িনি।”
কিন্তু যখন তাঁকে সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং যুদ্ধের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসতে পারে বলে যাঁরা আশা করেছিলেন তাঁদের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হল, আজাদেহ থেমে গেলেন।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর শান্ত ভাবে জানালেন, এই প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে চান না। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
ইরানে প্রকাশ্যে রাজনীতি নিয়ে কথা বলার ঝুঁকি যে কতটা, সেই ছোট্ট মুহূর্তটিই যেন তার ইঙ্গিত।
ট্রেনের শয়নকক্ষে পরিবার, কাজ, দৈনন্দিন জীবন—সব কিছু নিয়েই অবাধে কথাবার্তা চলছে। কিন্তু রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলেই পরিবেশ বদলে যায়।
আজাদেহর সহযাত্রী সেপিদেহ অবশ্য তুলনায় বেশি খোলামেলা। পেশায় রূপচর্চাকর্মী এই তরুণী বলেন,
“আমি ইরানকে ভালবাসি। ভীষণ ভালবাসি। কিন্তু যখন দেখি আমার যৌবন চলে যাচ্ছে, আমার স্বপ্নগুলো একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আমার সামনে আর কোনও পথ থাকে না।”
ট্রেনের আরও খানিকটা ভিতরে দুই তরুণ ফুটবলারের সঙ্গে দেখা। কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর দেশের ঘরোয়া ফুটবল প্রতিযোগিতা আবার শুরু হয়েছে। খেলা শেষে তাঁরা বাড়ি ফিরছেন।
তাঁদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—যুদ্ধের কোন স্মৃতিটা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?
আবদোল্লাহর উত্তর এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।
“ওরা এমন একটা স্কুলে হামলা করেছিল, যেখানে শুধু বাচ্চারা ছিল। সাত, আট, নয় বছরের শিশু। গোটা দেশ ভেঙে পড়েছিল। ওদের শেষকৃত্যের দিন… সবাই কেঁদেছিল।”
সেই স্কুলই শাজারেহ তাইয়েবেহ।
আর তার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এখনও পড়ে রয়েছে আট বছরের মাহিয়া সালারির খাতা।
বন্দর আব্বাসে পৌঁছে সেখান থেকে রাস্তা চলে গিয়েছে দেশের ভিতরের দিকে, মিনাবের দিকে। গাড়িতে যেতে সময় লাগে প্রায় দু’ঘণ্টা। খেজুরগাছ আর জমজমাট বৃহস্পতিবারের বাজারের জন্য একসময় পরিচিত ছিল শহরটি। এখন মিনাবের পরিচয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যুদ্ধ।
রাস্তার প্রায় সর্বত্র সেই চিহ্ন।
স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত শিশুদের ছবি ঝুলছে বাড়ির দেওয়াল থেকে, রাস্তার বাতিস্তম্ভে। শহরের প্রান্তে শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যা অবশিষ্ট রয়েছে, তাকে আর স্কুল বলা কঠিন।
কংক্রিটের একটির উপর আর একটি তলা ধসে পড়েছে। ভেঙে যাওয়া শ্রেণিকক্ষের ভিতর থেকে বেরিয়ে রয়েছে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ইস্পাতের রড। খননযন্ত্র এখনও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে চলেছে।
সেই ধ্বংসস্তূপেই পাওয়া গিয়েছিল মাহিয়া সালারির খাতা।
সেদিন আট বছরের মাহিয়া স্কুলে গিয়েছিল তার ছোট ভাই আলিকে নিয়ে। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার কিছুক্ষণ আগে তাদের মা স্কুলে এসেছিলেন দুই সন্তানকে বাড়ি নিয়ে যেতে।
তিন জনের কেউই আর বাড়ি ফিরতে পারেননি।
মা, মাহিয়া এবং আলি—তিন জনই নিহত হন।
আমিনেহ নাদেমি এই স্কুলে ছ’বছর প্রথম শ্রেণির শিশুদের পড়িয়েছেন। ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “এটাকে আর স্কুল বলা যায় না। এখন শুধু কয়েকটা দেওয়াল পড়ে রয়েছে। সেই দেওয়াল থেকে মৃত্যু, শোক আর রক্তের গন্ধ বেরোয়।”
হামলার পরের দৃশ্য এখনও তাঁর চোখে ভাসে।
সন্তানদের খুঁজতে বাবা-মায়েরা খালি পায়ে ছুটে আসছিলেন স্কুলের দিকে।
নাদেমি বলেন, “প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, সবাই বেরিয়ে যেতে পেরেছে। আমি জানতামই না যে ওরা সবাই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে।”
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এখনও এই স্কুলে বোমা পড়ার বিষয়ে কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। স্কুলটির লাগোয়া একটি সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। সেই অভিযানের সময়ই স্কুলে আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্র।
ইরানের রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকর্মী রেজা বেশারাতি সেদিন ঘটনাস্থলে ছিলেন। পাঁচ মাস কেটে গেলেও সেই সকাল তাঁকে ছাড়েনি।
তিনি বলেন, “এখনও সব কিছু মনে পড়ে। প্রত্যেকটা দৃশ্য।”
কিন্তু মিনাবের এই ধ্বংসস্তূপ শুধু নিহত শিশুদের স্মৃতি বহন করছে না। যুদ্ধ সম্পর্কে ইরানের একাংশের মানুষের মনোভাবও বদলে দিয়েছে এই ঘটনা।
যাঁদের কেউ কেউ একসময় মনে করতেন, বিদেশি চাপ বা সামরিক আঘাত হয়তো ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে, তাঁদের অনেকের কাছেই মিনাব হয়ে উঠেছে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা।
এক প্রাক্তন সরকারবিরোধী আন্দোলনকারী বলেন, “যুদ্ধ হবে—সেটা একটা সময় আমি মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু নিরীহ মানুষকে হত্যার বিনিময়ে নয়।”
তার পরেই তাঁর সংযোজন, “যুদ্ধ সব কিছু ধ্বংস করে দেয়। ভাল মানুষ আর খারাপ মানুষের মধ্যে যুদ্ধ কোনও তফাত করে না।”
এই কথাটিই সম্ভবত যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বৈপরীত্যকে সামনে আনে।
যুদ্ধের আগে যাঁদের ক্ষোভ ছিল মূলত নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধে, তাঁদের একাংশের কাছে বিদেশি আক্রমণের পর প্রশ্নটি বদলে গিয়েছে। সরকারের বিরোধিতা এবং নিজের দেশের উপর বাইরের শক্তির সামরিক আক্রমণকে সমর্থন করা যে এক বিষয় নয়, সেই উপলব্ধি অনেকের মধ্যেই তৈরি হয়েছে।
তার সবচেয়ে নির্মম প্রমাণ মিনাবের কবরস্থানে।
দুপুরের তীব্র রোদ। ছোট ছোট কবরের সারির মাঝখান দিয়ে শিশুরা হেঁটে যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যেরা যতটা সম্ভব ছায়ায় দাঁড়িয়ে বা বসে রয়েছেন।
এই কবরস্থানেই প্রায় প্রতিদিন আসেন মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি।
স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাঁর নয় বছরের মেয়ে সেতায়েশ নিহত হয়েছিল।
মেয়েকে খুঁজতে যখন তিনি স্কুলে পৌঁছেছিলেন, তখন চারদিকে ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপ।
সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি যখন সেখানে পৌঁছলাম, তখন শুধু ধোঁয়ার আর শিশুদের চুল পোড়ার গন্ধ পাচ্ছিলাম।”
তার পর তিনি যা দেখেছিলেন, তা আরও ভয়াবহ।
“আমি একটা হাত দেখেছিলাম। একটা পা দেখেছিলাম। ওদের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।”
মিনাব থেকে পশ্চিমে বন্দর আব্বাস।
ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক বন্দর। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর প্রবেশদ্বার।
মিনাব যদি এই যুদ্ধকে ঘিরে ইরান সরকারের অসামরিক মানুষের আত্মত্যাগ ও যন্ত্রণার বয়ানের প্রতীক হয়ে থাকে, তা হলে বন্দর আব্বাস সেই জায়গা, যেখান থেকে ইরান তার সামরিক ও ভূকৌশলগত শক্তির বার্তা দেয়।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়।
বিশ্বের ব্যস্ততম সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলির অন্যতম এই সরু জলপথের উপর ইরান কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যুদ্ধের সময় সেটিই হয়ে ওঠে তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
বন্দর আব্বাসে ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনীর ঘাঁটি রয়েছে। পাশাপাশি এখানেই রয়েছে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি।
ফলে যুদ্ধের শুরু থেকেই শহরটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্য।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে বন্দর আব্বাস এবং তার আশপাশে অন্তত ৯৬টি মার্কিন হামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
শহরের সমুদ্রতটে অবশ্য যুদ্ধের অন্য ছবি।
জেলেরা কাজ করছেন। দূরে নোঙর করে রয়েছে পণ্যবাহী জাহাজ। অনেক জাহাজ এখনও অপেক্ষা করছে—কবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে এগোনোর সুযোগ মিলবে।
মাসের পর মাস ধরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে।
তার সরাসরি মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে।
অনেক জেলে এবং বন্দরনির্ভর শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে নিয়মিত আয় করাই অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ মিনাবে যুদ্ধের মুখ শিশুদের কবর।
বন্দর আব্বাসে সেই একই যুদ্ধের মুখ—স্থবির জাহাজ, অনিশ্চিত জীবিকা এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বিশ্বশক্তির সংঘাত।
কিন্তু তেহরানে ফিরে গেলে দেখা যায় আরও একটি সম্পূর্ণ আলাদা ছবি।
সেখানে যুদ্ধের অর্থ শুধু ধ্বংস বা অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়।
সেখানে যুদ্ধকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে জাতীয় ঐক্যের আর একটি রাজনৈতিক বয়ান।
তেহরানে আলি খামেনেয়ির শেষযাত্রা সেই পরিবর্তিত ইরানেরই এক বিরাট প্রদর্শনী হয়ে উঠেছিল।
রাস্তায় নেমেছিলেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। শোকের কালো পোশাক, ইরানের জাতীয় পতাকা, ধর্মীয় পতাকা—সব মিলিয়ে রাজধানীর বিস্তীর্ণ অংশ যেন মানুষের সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। ভিড় থেকে বারবার উঠছিল পরিচিত স্লোগান—‘আমেরিকার মৃত্যু’, ‘ইজরায়েলের মৃত্যু’।
কিন্তু সেই জনসমুদ্রকে শুধুই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অনুগত সমর্থকদের সমাবেশ বলে ব্যাখ্যা করলে যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন চোখ এড়িয়ে যায়।
কারণ, যুদ্ধের আগে যাঁরা আলি খামেনেয়ি এবং তাঁর শাসনব্যবস্থার বিরোধী ছিলেন, তাঁদের একাংশও বিদেশি হামলার পর নিজেদের অবস্থান নতুন করে বিচার করতে শুরু করেছেন।
তাঁদের বক্তব্য মোটামুটি একই—ইরানের সরকারের বিরোধিতা করা যায়, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ইরানের উপর বিদেশি সামরিক হামলাকে স্বাগত জানাতে হবে।
এই পার্থক্যটাই যুদ্ধের আগে এতটা স্পষ্ট ছিল না।
ইরানে গত কয়েক বছরে একের পর এক সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছে। নারীর অধিকার, বাধ্যতামূলক হিজাব, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের দমননীতি নিয়ে ক্ষোভ জমেছে। বহু তরুণ-তরুণী প্রকাশ্যেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
ফলে ইজরায়েল এবং পরে আমেরিকার আক্রমণের আগে দেশের বাইরে একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল—ইরানের ভিতরে সরকারের প্রতি ক্ষোভ এত গভীর যে সামরিক আঘাত শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করলে সাধারণ মানুষের একটি অংশ হয়তো তাকে স্বাগত জানাবে।
যুদ্ধ সেই হিসাব অনেকটাই বদলে দিয়েছে।
মিনাবের স্কুলে শিশুদের মৃত্যু, বিভিন্ন শহরে অসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং পরিকাঠামোর ধ্বংস বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের বাস্তব চেহারাটি সামনে এনে দেয়।
শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বিমূর্ত আকাঙ্ক্ষার জায়গায় চলে আসে অনেক বেশি প্রত্যক্ষ একটি প্রশ্ন—তার মূল্য কে দেবে?
উত্তরটি পাওয়া যাচ্ছিল মিনাবের কবরস্থানে।
শিশুরা।
সাধারণ পরিবার।
যাঁদের রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই।
এই কারণেই যুদ্ধ ইরানের রাজনৈতিক বিভাজন সম্পূর্ণ মুছে না দিলেও একটি নতুন জাতীয়তাবোধ তৈরি করেছে।
একজন সরকারবিরোধী হওয়া এবং একজন ইরানি হওয়ার মধ্যে যে কোনও বিরোধ নেই—বরং বিদেশি আক্রমণের মুখে দ্বিতীয় পরিচয়টি সাময়িক ভাবে প্রথমটির চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে—যুদ্ধ সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।
তেহরানের রাস্তায় তার প্রতিফলন ছিল স্পষ্ট।
আলি খামেনেয়ি জীবিত অবস্থায় ছিলেন গভীর ভাবে বিভাজন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। তাঁর ছবিতে আগুন দেওয়া হয়েছে। তাঁর পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।
কিন্তু তাঁর মৃত্যু যখন বিদেশি শক্তির সঙ্গে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ঘটল, তখন তাঁর শেষযাত্রা শুধুই একজন ধর্মীয় নেতার অন্ত্যেষ্টি থাকল না।
রাষ্ট্র সেটিকে পরিণত করল জাতীয় প্রতিরোধের প্রতীকে।
আর এখানেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়।
বহু বছর ধরে অর্থনৈতিক সঙ্কট, নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি, সামাজিক বিধিনিষেধ এবং রাজনৈতিক দমনের কারণে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, বিদেশি আক্রমণ অন্তত সাময়িক ভাবে সেই ব্যবধান কমিয়ে দেয়।
রাষ্ট্রের বার্তা ছিল সহজ—দেশ আক্রান্ত; এখন অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের সময় নয়।
এই বার্তা কতটা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেছেন এবং কতটা রাষ্ট্রের প্রচারযন্ত্রের সাফল্য, তা নির্ণয় করা কঠিন।
কারণ যুদ্ধকালীন ইরানে স্বাধীন ভাবে জনমত যাচাই করাও সহজ নয়।
তার পরেও একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন—যুদ্ধের আগে সরকারবিরোধী মানুষের যে অংশ বিদেশি চাপকে শাসন পরিবর্তনের সম্ভাব্য অনুঘটক হিসেবে দেখতেন, তাঁদের অন্তত একাংশের মনোভাব বদলেছে।
বিদেশি বোমা তাঁদের কাছে আর মুক্তির সম্ভাবনা নয়।
বরং নতুন আতঙ্ক।
এক তরুণ ইরানির কথায় সেই দ্বন্দ্বের সারাংশ ধরা পড়ে—তিনি নিজের দেশের সরকারকে সমর্থন করেন না, কিন্তু অন্য কোনও দেশ এসে তাঁর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করুক, সেটিও চান না।
এই মনোভাব ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে সমর্থনের সমার্থক নয়।
বরং এটি ইরানি জাতীয়তাবাদের আরও পুরনো একটি প্রবণতার পুনরুত্থান—বিদেশি শক্তি দেশের রাজনীতি নির্ধারণ করবে, এই ধারণার প্রতি গভীর অবিশ্বাস।
ইরানের আধুনিক ইতিহাসে সেই স্মৃতি অত্যন্ত শক্তিশালী।
বিদেশি হস্তক্ষেপ, অভ্যুত্থান, যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা বারবার ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে জুড়ে দিয়েছে।
বর্তমান যুদ্ধও সেই পুরনো ক্ষতকে নতুন করে খুলে দিয়েছে।
ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
যে যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার কথা ভাবা হয়েছিল, সেই যুদ্ধই কি শেষ পর্যন্ত তাকে রাজনৈতিক ভাবে কিছুটা শক্তিশালী করে দিল?
উত্তর এখনও নিশ্চিত নয়।
কারণ যুদ্ধ শেষ হলেই পুরনো প্রশ্নগুলি আবার ফিরে আসবে—নারীর স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনীতি, বেকারত্ব, নিষেধাজ্ঞা এবং রাষ্ট্রের কঠোর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ।
জাতীয় ঐক্যের আবেগ চিরস্থায়ী হয় না।
কিন্তু মিনাব থেকে তেহরান পর্যন্ত ঘুরলে অন্তত একটি পরিবর্তন স্পষ্ট।
যুদ্ধ ইরানিদের সব মতপার্থক্য মুছে দেয়নি।
বরং একটি নতুন সীমারেখা এঁকেছে—
সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই এক জিনিস। দেশের উপর বিদেশি আক্রমণ মেনে নেওয়া সম্পূর্ণ অন্য জিনিস।
আর পাঁচ মাসের যুদ্ধের পরে ইরানের রাজনীতি বোঝার জন্য সম্ভবত এই পার্থক্যটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
( দ্য গার্ডিয়েনের সৌজন্যে)