আকাশে শতাব্দীর ‘ম্যাজিক’

যা জানা জরুরি
- মাদ্রিদ: আকাশের দিকে চোখ, হাতে ক্যামেরা—স্পেনের ছোট শহর ও গ্রামগুলিতে এখন যেন উৎসবের আবহ।
- বুধবার সন্ধ্যায় বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে উত্তর ও মধ্য স্পেনে জড়ো হয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।
- জ্যোতির্বিজ্ঞানী, আলোকচিত্রী, পর্যটক থেকে শুরু করে বছরের পর বছর এই মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকা গ্রহণপ্রেমী—সকলের লক্ষ্য একটাই, চাঁদের ছায়ায় মুহূর্তের জন্য সূর্যকে হারিয়ে যেতে দেখা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মাদ্রিদ: আকাশের দিকে চোখ, হাতে ক্যামেরা—স্পেনের ছোট শহর ও গ্রামগুলিতে এখন যেন উৎসবের আবহ। বুধবার সন্ধ্যায় বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে উত্তর ও মধ্য স্পেনে জড়ো হয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, আলোকচিত্রী, পর্যটক থেকে শুরু করে বছরের পর বছর এই মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকা গ্রহণপ্রেমী—সকলের লক্ষ্য একটাই, চাঁদের ছায়ায় মুহূর্তের জন্য সূর্যকে হারিয়ে যেতে দেখা।
প্রতিবেশী দেশ তো বটেই, আমেরিকা ও জাপান থেকেও বহু মানুষ ছুটে এসেছেন স্পেনে। কারণ এই পূর্ণগ্রাসের পথ আ কোরুনিয়ার আটলান্টিক উপকূল থেকে দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরের মায়োর্কা পর্যন্ত বিস্তৃত। গিজন, ওভিয়েদো, লিয়ন, বুর্গোস, সারাগোসা, ভ্যালেন্সিয়া ও পালমা—একাধিক শহর থেকেই দেখা যাবে বিরল এই মহাজাগতিক দৃশ্য।
স্থানভেদে স্পেনের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৮টা ২৬ থেকে ৮টা ৩৩ মিনিটের মধ্যে পূর্ণগ্রাসের পর্যায় দেখা যাবে। ঘটনাটি আরও বিশেষ, কারণ স্পেনের উপর দিয়ে এর আগে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের পথ গিয়েছিল ১৯০৫ সালে। অর্থাৎ ১২১ বছর পর ফের এমন দৃশ্যের সাক্ষী হতে চলেছে দেশটি।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পূর্ণগ্রাসের পথ ধরে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ জড়ো হতে পারেন। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যাও প্রায় ৪ লক্ষ ৬০ হাজারে পৌঁছতে পারে বলে অনুমান। বহু হোটেল, অতিথিশালা এবং গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র মাস কয়েক আগেই বুক হয়ে গিয়েছে। আ কোরুনিয়া-সহ কয়েকটি শহরে থাকার খরচও বেড়েছে কয়েক গুণ।
গ্রহণ দেখতে সবচেয়ে আলোচিত জায়গাগুলির একটি বুর্গোস প্রদেশের ছোট্ট গ্রাম ভিলালিবাদো। একসময় প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়া এই গ্রামেই এবার তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। নাসা এবং সান ফ্রান্সিসকোর এক্সপ্লোরেটোরিয়ামের প্রায় ৩০ জন বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ সেখানে দূরবীক্ষণ যন্ত্র বসিয়েছেন। সান সালভাদোর গির্জার পাশে তৈরি ওই কেন্দ্র থেকেই গ্রহণের ছবি নাসার মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
বুর্গোসে আংশিক গ্রহণ শুরু হওয়ার কথা সন্ধ্যা ৭টা ৩৩ মিনিট নাগাদ। রাত ৮টা ২৮ মিনিটের পর সূর্য পুরোপুরি ঢেকে যাবে এবং প্রায় ১ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড স্থায়ী হবে পূর্ণগ্রাস। তবে এই গ্রহণের বিশেষত্ব শুধু তার বিরলতায় নয়—সূর্য তখন দিগন্তের খুব কাছাকাছি থাকবে।
তাই বিজ্ঞানীরা পশ্চিম দিগন্ত খোলা এমন জায়গা বেছে নিতে বলছেন। আকাশ পরিষ্কার থাকলে অস্তগামী সূর্যের চারপাশে চাঁদের কালো চাকতির বাইরে জ্বলজ্বল করবে সূর্যের করোনা। এক জ্যোতির্বিজ্ঞানীর ভাষায়, “এটি অপূর্ব হতে চলেছে।”
পূর্ণগ্রাসের কয়েক মুহূর্তে দিনের আলো আচমকা ফিকে হয়ে যাবে। সামান্য কমতে পারে তাপমাত্রাও। আকাশে দেখা দিতে পারে উজ্জ্বল গ্রহ ও নক্ষত্র। আর সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ পুরোপুরি আড়াল হলে বাইরে বেরিয়ে আসবে তার বহির্বায়ুমণ্ডল—করোনা। মুক্তোর মতো সাদা সেই আভাই বিজ্ঞানীদের কাছেও সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যগুলির একটি।
এই অল্প সময়ই বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। করোনার গঠন, সৌরবায়ু এবং সূর্যের চৌম্বকীয় কার্যকলাপ নিয়ে তথ্য সংগ্রহে প্রস্তুত তাঁরা।
তবে মহাজাগতিক উৎসবের মাঝেও স্পেনের প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ। প্রবল গরম, শুষ্ক আবহাওয়া এবং চলতি বছরের ভয়াবহ দাবানলের আশঙ্কায় নেওয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দর্শকদের নিয়ন্ত্রণ এবং আগুনের ঝুঁকি কমাতে দেশজুড়ে ৬৬০টি সরকারি পর্যবেক্ষণস্থল নির্ধারণ করা হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে ৩৫ হাজারের বেশি পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী।
আতসবাজি, আগুন জ্বালানো, বারবিকিউ করা কিংবা জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরো ফেলার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। অরণ্যসংলগ্ন কিছু এলাকাতেও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। কারণ চলতি বছর ইতিমধ্যেই স্পেনে প্রায় দুই লক্ষ হেক্টর জমি দাবানলে পুড়ে গিয়েছে।
চোখের নিরাপত্তা নিয়েও সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। পূর্ণগ্রাসের বিশেষ কয়েকটি মুহূর্ত বাদ দিলে খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো বিপজ্জনক। সাধারণ রোদচশমা, রঙিন কাচ কিংবা ক্যামেরার লেন্স কোনওটাই নিরাপদ নয়। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গ্রহণ-চশমা। দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা ক্যামেরায় সূর্য দেখার সময়ও ব্যবহার করতে হবে উপযুক্ত সৌর-ছাঁকনি।
স্পেনই অবশ্য একমাত্র জায়গা নয়। গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং উত্তর আটলান্টিকের উপর দিয়েও পূর্ণগ্রাসের পথ যাবে। তবে মেঘের আশঙ্কায় বহু গ্রহণপ্রেমী শেষ মুহূর্তে স্পেনকেই বেছে নিয়েছেন। মূল পূর্ণগ্রাসের পথের বাইরে ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি ও উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে দেখা যাবে আংশিক গ্রহণ।
আর যাঁরা এই বিরল দৃশ্য দেখতে স্পেনে পৌঁছতে পারেননি, তাঁদের জন্যও থাকছে মহাজাগতিক ‘লাইভ শো’। ভিলালিবাদোর দূরবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা পড়া গ্রহণের ছবি সারা বিশ্বে সরাসরি সম্প্রচার করবে নাসা।
১২১ বছর পর স্পেনের আকাশে ফের সেই অন্ধকার—মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য সূর্য হারাবে, আর পৃথিবীর কোটি চোখ তাকিয়ে থাকবে সেই মহাজাগতিক মুহূর্তের দিকে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



