পুরুলিয়ায় কুর্মি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আগের সরকারের আমলে আন্দোলন-সংক্রান্ত সমস্ত মামলা প্রত্যাহার, প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বাইরে রাখা এবং কুর্মি উন্নয়ন পর্ষদ ফের সচল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ২০ সেপ্টেম্বর টামনা থানার কারাডিতে করম পরবের অনুষ্ঠানে এই ঘোষণার পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, এক বছরের মধ্যে জেলায় প্রতিরক্ষা, ইস্পাত, সিমেন্ট ও সৌরবিদ্যুৎ ক্ষেত্রে এক লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ আসবে। ঘোষণাগুলি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি; প্রত্যাহারের সরকারি আদেশ বা বিনিয়োগের সম্পূর্ণ চুক্তি এখনও প্রকাশিত হয়নি।

মামলা প্রত্যাহার করতে শুধু মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা যথেষ্ট নয়। সরকারকে প্রতিটি মামলা, ধারা ও অভিযুক্তের ভূমিকা পরীক্ষা করে আদালতের অনুমতি চাইতে হয়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, পথ বা রেল অবরোধ, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি এবং ব্যক্তির উপর হামলার অভিযোগ একইভাবে বিবেচিত হতে পারে না। মামলা তুলে নেওয়ার জনস্বার্থ আদালতের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে; সরকার অভিযোগ প্রত্যাহার চাইলে বিচারক স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা মঞ্জুর করতে বাধ্য নন।

কুর্মিদের প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বাইরে রাখার আশ্বাসও খসড়া আইনের উপর নির্ভরশীল। রাজ্য সরকার প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে কমিশন গড়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। কিন্তু কমিশনের সুপারিশ, বিধির চূড়ান্ত ভাষা এবং কোন সম্প্রদায় কী ভিত্তিতে অব্যাহতি পাবে—সেগুলি এখনও জনসমক্ষে নেই। অতএব ‘বাদ দেওয়া হয়ে গেছে’ বলার আগে লিখিত আইনি ব্যবস্থা দেখা প্রয়োজন।

সরকার চলতি বাজেটে কুর্মি উন্নয়নের জন্য ৫০ কোটি টাকা রেখেছে এবং নিষ্ক্রিয় উন্নয়ন পর্ষদ চালু করার কথা বলেছে। কুর্মালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এই পরিবর্তন রাজ্য একা করতে পারে না; সংসদে সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন। রাজবংশী ও কুর্মালি অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও কেন্দ্রের লিখিত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি।

কুর্মিদের তফসিলি জনজাতির স্বীকৃতির পুরনো দাবিটি ভাষার স্বীকৃতি বা উন্নয়ন পর্ষদ দিয়ে মিটে যায় না। সেই সিদ্ধান্তে নৃতাত্ত্বিক তথ্য, রাজ্য ও কেন্দ্রের সুপারিশ এবং জাতীয় তফসিলি জনজাতি কমিশনের মতামত প্রয়োজন। বিদ্যমান জনজাতিগুলির সংরক্ষণ-ভাগে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও মতভেদ আছে। সরকারকে প্রতিটি দাবির আলাদা আইনি পথ পরিষ্কার করে বলতে হবে; সব আশ্বাসকে একই রাজনৈতিক প্যাকেটে রাখলে প্রত্যাশা বাড়বে, সমাধান নয়।

অর্থনৈতিক ঘোষণায় রঘুনাথপুরে চার হাজার কোটি টাকার সমন্বিত ইস্পাত প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরের কথা উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ২৮ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রের সঙ্গে উড়ান প্রকল্পে পুরুলিয়া বিমানবন্দরের চুক্তি হওয়ার কথাও জানিয়েছেন। এক লক্ষ কোটি টাকার সম্ভাব্য বিনিয়োগের মধ্যে কোন সংস্থা, কত জমি, কত প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান এবং কতটি প্রকল্পে চূড়ান্ত আর্থিক অনুমোদন হয়েছে—সেই বিভাজন এখনও নেই। আগ্রহপত্র, প্রস্তাব, সমঝোতাপত্র ও নির্মাণাধীন বিনিয়োগ এক সংখ্যা নয়।

জঙ্গলমহলের রাজনীতিতে কুর্মি জনসমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের তফসিলি জনজাতি স্বীকৃতি, ভাষা ও উন্নয়ন দাবির সঙ্গে আগের আন্দোলনের পুলিশি মামলা যুক্ত হয়েছে। নির্বাচনের পরে নতুন সরকারের বৃহৎ আশ্বাস তাই প্রশাসনিক সংশোধনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ার প্রচেষ্টা। কিন্তু এক সম্প্রদায়ের সমর্থন পাওয়ার জন্য অপরাধের প্রকৃতি না-দেখে মামলা তোলা হলে আইনের সমতার প্রশ্ন উঠবে।

একইভাবে বিনিয়োগের বড় অঙ্ক দিয়ে উন্নয়ন মাপা যাবে না। স্থানীয় জমির অধিকার, জল, দূষণ, বাস্তুচ্যুতি, দক্ষতা ও স্থায়ী চাকরি নির্ধারণ করবে পুরুলিয়ার বাস্তব লাভ। তফসিলি জনজাতির স্বীকৃতি রাজ্য সরকারের একক ঘোষণায় হয় না; কেন্দ্রীয় আইনগত ও নৃতাত্ত্বিক যাচাইয়ের পৃথক পথ রয়েছে—সেটিও স্পষ্ট বলা দরকার। প্রতিটি প্রতিশ্রুতির জন্য সময়সীমা ও প্রকাশ্য অগ্রগতি-তালিকা দরকার—কত মামলা আদালতে তোলা হল, পর্ষদ কবে বসল, বিমানবন্দর চুক্তি হল কি না, আর ঘোষিত মূলধনের কতটা মাটিতে নামল। করমের মঞ্চে আস্থার কথা বলা সহজ; সেই আস্থাকে সরকারি নথিতে রূপ দেওয়াই এখন পরীক্ষা।