হাইলাইটস:

  • ১৬ বছর আগে কিশোর রদ্রি লেকের ধারে ল্যাপটপে দেখেছিলেন স্পেনের প্রথম বিশ্বকাপ জয়; এবার অধিনায়ক হিসেবে নিজেই তুললেন ট্রফি।
  • অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন।
  • পুরো টুর্নামেন্টে সমষ্টিগত ফুটবলের অসাধারণ প্রদর্শন; প্রতিপক্ষদের কার্যত শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছিল স্পেন।
  • লামিন ইয়ামালের সঙ্গে লিওনেল মেসির আবেগঘন আলিঙ্গন হয়ে উঠল প্রজন্ম বদলের প্রতীক।
  • কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের দীর্ঘ পরিকল্পনা, যুব ফুটবল থেকে গড়ে ওঠা দল এবং বিশ্বাসের দর্শনই এনে দিল বিশ্বজয়।

বাংলাস্ফিয়ার: কোনও বিশ্বকাপ কেবল ৯০ মিনিট বা ১২০ মিনিটের গল্প নয়। কোনও ট্রফি শুধুমাত্র একটি ম্যাচ জিতে অর্জিত হয় না। তার ভিত গড়ে ওঠে বহু বছর আগে, বহু অচেনা মাঠে, বহু অদৃশ্য পরিশ্রমের মধ্যে। স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ও তেমনই এক দীর্ঘ যাত্রার পরিণতি।

২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যখন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোলে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন, তখন ১৪ বছরের এক কিশোর যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের একটি গ্রীষ্মকালীন শিবিরে ছিল। সেমিফাইনাল দেখতে পারেনি, কারণ তখন সে ক্যানোয়িং করছিল। কিন্তু ফাইনালের রাতে এক প্রশিক্ষককে রাজি করিয়ে একটি ছোট ল্যাপটপে একা বসে ম্যাচটি দেখেছিল। ইনিয়েস্তার গোলের পর উত্তেজনায় লেকের চারপাশে দৌড়াতে শুরু করেছিল সে। সেই কিশোরের নাম রদ্রিগো হার্নান্দেস—আজকের ফুটবল বিশ্বের পরিচিত নাম রদ্রি।

১৬ বছর পরে, আবারও যুক্তরাষ্ট্রেই, তবে এবার মাঠের মাঝখানে। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেস গোল করার পর রদ্রি আবার ছুটলেন। তবে এবার লেকের ধারে নয়, সতীর্থদের দিকে। আর ম্যাচ শেষ হওয়ার পরে তিনিই বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুললেন। এক দর্শক থেকে এক নেতা হয়ে ওঠার এই যাত্রা যেন স্পেনের ফুটবলেরই প্রতিচ্ছবি।

ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুম ছিল উচ্ছ্বাস, ক্লান্তি এবং ইতিহাসের এক অনন্য মিশ্রণ। রদ্রির হাতে ছিল শুধু বিশ্বকাপ নয়, টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলারের পুরস্কারও। তরুণ তারকা পাও কুবার্সি জিতেছেন সেরা তরুণ ফুটবলারের সম্মান। গোলরক্ষক উনাই সিমোন পেয়েছেন গোল্ডেন গ্লাভস। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য ছিল বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিরূপ, বিশেষ বাক্সে সাজানো স্মারক, এমনকি লেগো দিয়ে তৈরি ট্রফিও। কেউ সঙ্গে নিয়েছেন ম্যাচের বল, কেউ বুট, কেউ জালের কাটা অংশ। স্মৃতিগুলিকে তারা যত্ন করে ভরে নিয়েছেন বড় বড় ব্যাগে।

এই জয়ের পেছনে কুসংস্কারও যেন নিজের জায়গা করে নিয়েছিল। ম্যাচ শুরুর আগে বাঁ-প্রান্তের ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়া চুপিসারে মাঠের ঘাসের নিচে একটি মুদ্রা পুঁতে রাখেন। ২০১০ সালে জোয়ান ক্যাপদেভিলাও নাকি একই কাজ করেছিলেন। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে—এই বিশ্বাস থেকেই সেই ছোট্ট আচার।

পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে এক আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয়। ২০১০ সালের নায়ক আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা এবং সাবেক অধিনায়ক সার্হিও রামোস নতুন প্রজন্মের হাতে বিশ্বকাপ তুলে দেওয়ার প্রতীকী ভূমিকা পালন করেন। পুরনো এবং নতুন স্পেন যেন এক সেতুবন্ধনে মিলিত হয়।

ম্যাচ শেষে আরও একটি ছবি বিশ্ব ফুটবলের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে থাকবে। লামিন ইয়ামাল এগিয়ে যান লিওনেল মেসির কাছে। মেসি বসেছিলেন, কিন্তু তরুণ স্প্যানিশ তারকাকে দেখে উঠে দাঁড়ান। দু’জনের আলিঙ্গন যেন এক যুগের সমাপ্তি এবং আরেক যুগের সূচনার প্রতীক হয়ে ওঠে। যে মেসিকে দেখে বড় হয়েছে নতুন প্রজন্ম, সেই মেসির কাছ থেকেই যেন উত্তরাধিকার গ্রহণ করলেন লামিন।

ফেরান তোরেসের কাছেও এই গোল ছিল ব্যক্তিগত মুক্তি। দীর্ঘ সময় ধরে সমালোচনা, ব্যর্থতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকটের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। তাই বিশ্বকাপ ফাইনালের নির্ণায়ক গোল তাঁর কাছে শুধুমাত্র জয়ের মুহূর্ত নয়, নিজের প্রতি বিশ্বাস ফিরে পাওয়ারও দিন।

ড্রেসিংরুমে শ্যাম্পেনের কর্ক খুললেও উদ্‌যাপন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রাতেই দেশে ফেরার বিমানের সময় ছিল। করিডর দিয়ে একে একে বেরিয়ে আসছিলেন খেলোয়াড়েরা। কারও হাতে বিশাল ব্যাগ, কারও হাতে ট্রফির বাক্স, কারও কাঁধে স্পিকার। লামিন ইয়ামাল এসেছিলেন কমলা রঙের সানগ্লাস, উল্টো করে পরা ক্যাপ এবং গলায় একাধিক চেন পরে—একেবারে নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসী মুখ।

কিন্তু এই বিশ্বকাপ শুধু আবেগের গল্প নয়, মাঠের পরিসংখ্যানও স্পেনের আধিপত্যের সাক্ষ্য দেয়।

পুরো ম্যাচে স্পেন প্রায় একতরফা ফুটবল খেলেছে। ফেরান তোরেসের গোল ছিল দলের ২০তম শট। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ১১৫ মিনিট পর্যন্ত কোনও শটই নিতে পারেনি। গোটা ম্যাচে তাদের একটি শটও লক্ষ্যে ছিল না। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। স্পেন শুধু বলের দখল রাখেনি, প্রতিপক্ষকে খেলতেই দেয়নি।

পুরো টুর্নামেন্টে প্রতি ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে প্রত্যাশিত গোলের গড় ছিল মাত্র ০.৩। গোলরক্ষক উনাই সিমোন মজা করে বলেন, তাঁর দস্তানাগুলিও হয়তো অভিযোগ করবে যে তাদের কাজই করতে হয়নি। এই পরিসংখ্যান দেখায়, আক্রমণ যেমন দুর্দান্ত ছিল, তেমনই রক্ষণ ছিল প্রায় অভেদ্য।

এই দলের সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। একসময় তৃতীয় বিভাগের ক্লাবে মাত্র ১১ ম্যাচের মধ্যেই চাকরি হারিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন কোনও ক্লাব তাঁকে ডাকেনি। পরে স্পেন ফুটবল ফেডারেশনের যুব দলের কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেন। অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২১ স্তরে একের পর এক সাফল্য এনে দেন। সেই প্রকল্পেরই চূড়ান্ত ফল আজকের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন।

এই দলে থাকা বহু ফুটবলারকে তিনি কিশোর বয়স থেকেই চেনেন। রদ্রি তাঁদের অন্যতম। ২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে যাঁদের নিয়ে যাত্রা শুরু, সেই প্রজন্মই আজ বিশ্বসেরা।

দে লা ফুয়েন্তে বারবার বলেছেন, তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি কোনও একক তারকা নয়, বরং দল। প্রত্যেক ফুটবলার জানে নিজের ভূমিকা, প্রত্যেকে অন্যের জন্য দৌড়ায়। এই সমষ্টিগত দর্শনই স্পেনকে আলাদা করেছে।

মার্ক কুকুরেয়া বিশ্বকাপ জিতলে কোচের মুখের ট্যাটু করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জয়ের পরে কোচ মজা করে বলেন, এখন আর প্রতিশ্রুতি এড়ানোর উপায় নেই। হাসির এই মুহূর্তও আসলে দলের পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সম্পর্কেরই প্রতিফলন।

এই বিশ্বকাপে রদ্রিও ফিরে এসেছেন দীর্ঘ চোট কাটিয়ে। হাঁটুর গুরুতর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার পরে অনেকেই ভেবেছিলেন, আগের রদ্রিকে আর দেখা যাবে না। কিন্তু তিনি ফিরে এসে শুধু খেলেননি, পুরো টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলারও হয়েছেন। সর্বাধিক পাস, সর্বাধিক ট্যাকল এবং অসামান্য নেতৃত্ব দিয়ে তিনি স্পেনের মেরুদণ্ডে পরিণত হন।

দেশে ফেরার বাসে ওঠার সময় তাঁর হাতে ছিল আসল বিশ্বকাপ ট্রফি। হয়তো সেই মুহূর্তে তাঁর মনে পড়ছিল ১৪ বছর বয়সী সেই ছেলেটির কথা, যে একদিন লেকের ধারে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে দৌড়েছিল।

স্বপ্ন দেখেছিল সে। ১৬ বছর পরে সেই স্বপ্নই বাস্তব হয়ে তার হাতের মুঠোয় ধরা দিল। স্পেনও প্রমাণ করল, বিশ্বকাপ জেতে শুধু প্রতিভা নয়—জেতে পরিকল্পনা, ধৈর্য, বিশ্বাস এবং এক অটুট দলগত দর্শন।