হাইলাইটস
- তীব্র গরম উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ মাদ্রিদের রাস্তায় নেমে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখেন।
- প্লাজা দে কোলোনে কলম্বাসের মূর্তির নিচে বিশাল পর্দায় স্পেন–আর্জেন্টিনা ম্যাচ উপভোগ করেন সমর্থকেরা।
- দীর্ঘ সময় গোলশূন্য ও একঘেয়ে ম্যাচে দর্শকদের মধ্যে অধৈর্য বাড়লেও ফেরান তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের গোলে উল্লাসে ফেটে পড়ে রাজধানী।
- শেষ বাঁশি বাজতেই কান্না, আলিঙ্গন, পতাকা আর আতশবাজিতে ভরে ওঠে মাদ্রিদের রাত।
বাংলাস্ফিয়ার: তীব্র গরম, সোমবার অফিসে যাওয়ার চাপ—কোনও কিছুই মাদ্রিদের মানুষকে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। বিশ্বকাপ ফাইনালের রাতে রাজধানীর রাস্তাগুলো যেন উৎসবের শহরে পরিণত হয়েছিল।
রাত ৯টায় তাপমাত্রা তখনও প্রায় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শহরজুড়ে বার, পার্ক, মেলা প্রাঙ্গণ, এমনকি ষাঁড়ের লড়াইয়ের ঐতিহ্যবাহী অঙ্গনেও ভিড় জমিয়েছিলেন মানুষ। হাতে লাল-হলুদ স্প্যানিশ পতাকা, মুখে জাতীয় দলের স্লোগান—সবাই অপেক্ষা করছিলেন ইতিহাসের আরেকটি মুহূর্তের জন্য।
মাদ্রিদের মানসানারেস নদীর ধারে বিশাল পর্দা, ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার মভিস্তার অ্যারেনা এবং বিশেষ করে প্লাজা দে কোলোন—সবখানেই ছিল উপচে পড়া ভিড়। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের বিশাল মূর্তির নিচে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ ম্যাচ দেখেন। মাথার ওপর উড়ছিল স্পেনের সবচেয়ে বড় জাতীয় পতাকা—২১ মিটার লম্বা, ১৪ মিটার চওড়া এবং ৩৫ কেজি ওজনের এক বিশাল পতাকা।
এই স্থানটির প্রতীকী গুরুত্বও ছিল আলাদা। কারণ, একসময়ের উপনিবেশ আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে স্পেন খেলছিল কলম্বাসের মূর্তির ছায়ায়। ম্যাচের আগে স্পেনে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত ভেনসেসলাও বুনহে এক ভিডিও বার্তায় দুই দেশকে “ভ্রাতৃপ্রতিম” বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “স্পেন ও আর্জেন্টিনা—দুই দেশের মধ্যে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সম্পর্কের গভীর বন্ধন রয়েছে। এই ফাইনাল হোক খেলাধুলার প্রকৃত মূল্যবোধ—পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক দৃষ্টান্ত।”
১৬ বছর আগে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার অতিরিক্ত সময়ের গোলে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল স্পেন। এবার লক্ষ্য ছিল দ্বিতীয় শিরোপা। অন্যদিকে, ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা চেয়েছিল চতুর্থ বিশ্বকাপ।
ম্যাচ শুরুর আগে প্লাজা দে কোলোনে বারবার ধ্বনিত হচ্ছিল, “আ পোর লা সেগুন্দা!”—অর্থাৎ “চলো, দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতি।”
চিলি থেকে আসা সেবাস্তিয়ান এরোস অবশ্য ফলাফল নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন ছিলেন না।
তিনি বলেন, “স্পেন জিতলে ভালো। আর আর্জেন্টিনা জিতলেও আপত্তি নেই। অন্তত বিশ্বকাপটা দক্ষিণ আমেরিকাতেই থাকবে।”
অন্যদিকে ১৮ বছরের মাদ্রিদবাসী ক্যাটি ছিলেন ভীষণ আবেগপ্রবণ।
“এটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি যখন দুই বছরের শিশু, তখন স্পেন প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল। এবার নিজের চোখে দেখতে চাই,” বলেন তিনি।
তোলেদো থেকে আসা ৩৭ বছরের মিগেল হিনোহাল ভিসেন্তে ২০১০ সালের স্মৃতি ভুলতে পারেননি।
“সেটা ছিল জাদুকরী এক রাত। যদিও আমি স্পেনের চেয়ে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের বড় সমর্থক,” বলেন তিনি।
তার বন্ধু রাকেল গার্সিয়া আরও আবেগঘন ভাষায় বলেন, “এটা শুধু ফুটবল নয়। এটা একটা দেশের আশা, ঐক্য আর আনন্দের প্রতীক।”
কিন্তু ম্যাচ যত এগোতে থাকে, দর্শকদের ধৈর্য তত ফুরোতে থাকে। ধীরগতির খেলা, প্রচণ্ড গরম, ভুভুজেলার একঘেয়ে শব্দ এবং গাঁজার ধোঁয়ায় অনেকেই বিরক্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ ক্লান্তিতে দরজার ধারে বসেই ঝিমিয়ে পড়েন।
অবশেষে অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে নিকো উইলিয়ামস গোল করলেও তা অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। মুহূর্তের উল্লাস আবার হতাশায় বদলে যায়।
কিন্তু ১৭ মিনিট পরে ফেরান তোরেস গোল করতেই পুরো প্লাজা যেন বিস্ফোরিত হয়।
হাজারো মানুষের একসঙ্গে চিৎকার, আলিঙ্গন, হাসি, আতশবাজি আর লাল-হলুদ পতাকার ঢেউয়ে মুহূর্তেই বদলে যায় পরিবেশ। দীর্ঘ অপেক্ষার সব ক্লান্তি যেন মিলিয়ে যায় এক নিমেষে।
রাত বারোটার কিছু পরে শেষ বাঁশি বাজতেই প্লাজা দে কোলোনে উপস্থিত সমর্থক, পুলিশ, চিকিৎসাকর্মী—সবাই একসঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়েন। কেউ কাঁদছেন, কেউ অপরিচিত মানুষকে জড়িয়ে ধরছেন।
রাতের আকাশে তখন একটাই স্লোগান—
“আ পোর লা সেগুন্দা?”
উত্তর আসে হাজারো কণ্ঠে—
“সি, সেনিয়র!” — “হ্যাঁ, অবশ্যই!”