হাইলাইটস:

  • অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ ব্যবধানে সুইৎজারল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ চারে আর্জেন্টিনা
  • প্রথমে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের গোল, পরে সমতা ফেরান দান এনদোয়ে
  • লাল কার্ডে ১০ জনে নেমে পড়ার পরও সুইৎজারল্যান্ড কঠিন লড়াই দেয়
  • শেষ পর্যন্ত হুলিয়ান আলভারেজের দুরন্ত গোল এবং লাউতারো মার্তিনেজের নিশ্চিত করা গোলেই জয়
  • সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড; বহু প্রতীক্ষিত মেসি বনাম ইংল্যান্ড দ্বৈরথ

বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে দেখে একসময় মনে হচ্ছিল, ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ানো শুধু সময়ের অপেক্ষা। নির্ধারিত সময়ে ১-১ সমতার পর অতিরিক্ত সময়েরও অধিকাংশ কেটে গিয়েছে। সামনে সুসংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং দশজনের সুইৎজারল্যান্ড। লিওনেল মেসি বারবার চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি তৈরি করতে পারছিলেন না। এমন সময় নায়কের আবির্ভাব হুলিয়ান আলভারেজের। ম্যাচ শেষ হতে যখন আর মাত্র আট মিনিট বাকি, তখন প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে ডান পায়ের অবিশ্বাস্য এক বাঁকানো শটে গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের নাগালের বাইরে বল জড়িয়ে দেন জালে। সেই গোলই বদলে দেয় ম্যাচের ভাগ্য।

এরপর শেষ মুহূর্তে লাউতারো মার্তিনেজ ফিরতি বলে গোল করে ৩-১ ব্যবধান নিশ্চিত করেন। ফলে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় লড়াই জিতে আর্জেন্টিনা পৌঁছে যায় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। সেখানে অপেক্ষা করছে ইংল্যান্ড। চার দশকেরও বেশি সময় পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি। ১৯৮৬ সালের দিয়েগো মারাদোনার ‘ঈশ্বরের হাত’-এর ম্যাচের পর এই দ্বৈরথ ঘিরে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।

ম্যাচের শুরুটা অবশ্য সম্পূর্ণ আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণে ছিল। সুইৎজারল্যান্ড প্রথম কয়েক মিনিট সাহসী ফুটবল খেললেও দশ মিনিটের মধ্যেই এগিয়ে যায় লিওনেল স্কালোনির দল। কর্নার থেকে মেসির নিখুঁত ভাসানো বলে অসাধারণ হেডে গোল করেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। প্রথম দর্শনে গোলটি কিছুটা ভাগ্যের বলে মনে হলেও রিপ্লেতে স্পষ্ট হয়, অসাধারণ দক্ষতায় বলটিকে কোবেলের নাগালের বাইরে পাঠিয়েছিলেন তিনি।

গোলের পর ম্যাচের গতি কার্যত থেমে যায়। আর্জেন্টিনা বলের দখল রেখে ধীরে ধীরে খেলা নিয়ন্ত্রণ করে। সুইসরা চাপ তৈরি করার মতো সাহস দেখাতে পারছিল না। প্রথমার্ধে দর্শকদের উত্তেজিত করার মতো মুহূর্ত ছিল হাতে গোনা। একবার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের ভুলে ব্রিল এম্বোলো সুযোগ পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ দ্রুত বেরিয়ে এসে বিপদ সামাল দেন।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে এম্বোলোর একটি কঠোর ট্যাকলে লিয়ান্দ্রো পারেদেস মাটিতে পড়ে যান। সেই অপরাধে হলুদ কার্ড দেখেন এম্বোলো। পরে সেই কার্ডই সুইৎজারল্যান্ডের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছিল। মেসির দুর্দান্ত পাস থেকে নাহুয়েল মোলিনা ফাঁকা জায়গা পেয়েও লক্ষ্যভ্রষ্ট হন। আলভারেজের শটও প্রতিহত হয়। কিন্তু গোল না হওয়ায় সুইৎজারল্যান্ড ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে।

ডান এনদোয়ে ছিলেন সুইস আক্রমণের সবচেয়ে বিপজ্জনক ফুটবলার। প্রথমে তাঁর হেড দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। এরপর গ্রানিত ঝাকার শটও কোনোমতে সামলান আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক। কিন্তু ৬৫ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি। রিকার্দো রদ্রিগেজের সঙ্গে সুন্দর বোঝাপড়ার পর এনদোয়ে ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে সমতা ফেরান। গোলটি পুরোপুরি প্রাপ্য ছিল সুইৎজারল্যান্ডের।

এই গোলের পর ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে পারত। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই বড় ভুল করেন এম্বোলো। পারেদেসের বিরুদ্ধে ফাউলের দাবি তুলে নাটকীয়ভাবে পড়ে যান তিনি। প্রথমে রেফারি পারেদেসকে হলুদ কার্ড দিলেও ভিডিও সহকারী রেফারির সহায়তায় সিদ্ধান্ত বদলান। রিপ্লেতে স্পষ্ট হয়, এম্বোলো ডাইভ দিয়েছিলেন। ফলে তাঁকেই দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করা হয়। চোখের জলে মাঠ ছাড়েন সুইস ফরোয়ার্ড।

দশজনের দল হয়েও সুইৎজারল্যান্ড শেষ পর্যন্ত অসাধারণ লড়াই চালিয়ে যায়। মেসি একবার গোল করলেও অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়। ম্যাক অ্যালিস্টারের আরেকটি হেড অল্পের জন্য বাইরে যায়। নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে গ্রেগর কোবেল অসাধারণ সেভ করে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিশ্চিত গোল বাঁচান।

অতিরিক্ত সময়েও কোবেল একাধিকবার আর্জেন্টিনাকে হতাশ করেন। মেসির শটও দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন তিনি। মনে হচ্ছিল টাইব্রেকারই একমাত্র পরিণতি। কিন্তু ১১২ মিনিটে আলভারেজ নিজের ব্যক্তিগত দক্ষতায় ম্যাচের ছবি বদলে দেন। ডান দিকে কেটে এসে দূরপাল্লার নিখুঁত বাঁকানো শটে তিনি কোবেলকে পরাস্ত করেন। বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলগুলির একটি উপহার দিয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে আবার এগিয়ে দেন।

সুইৎজারল্যান্ড তখন আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ম্যাচের শেষ দিকে কোবেল একটি শট ফিরিয়ে দিলেও ফিরতি বলে লাউতারো মার্তিনেজ গোল করে সব অনিশ্চয়তার অবসান ঘটান।

এই জয় শুধু আর্জেন্টিনাকে শেষ চারে তুলল না, বিশ্ব ফুটবলকে উপহার দিল আরেকটি স্বপ্নের লড়াই। সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। একদিকে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ জয়ের অভিযান, অন্যদিকে জুড বেলিংহ্যামদের নতুন প্রজন্ম। ইতিহাস, আবেগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমস্ত উপাদান নিয়ে বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সেমিফাইনালের মঞ্চ এখন প্রস্তুত।