- প্রথমবার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বড় ভূমিকা পাবে বেসরকারি ভারতীয় সংস্থা।
- ১৮০–২০০ কিলোমিটার পাল্লার অ্যাস্ট্রা মার্ক–২ তৈরির জন্য শীঘ্রই দরপত্র আহ্বান করবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।
- ইন্দোনেশিয়ার আগ্রহ ও সশস্ত্র বাহিনীর বাড়তি চাহিদার জেরেই নীতিগত পরিবর্তন।
দেশের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বড় নীতিগত পরিবর্তনের পথে কেন্দ্র। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও)-র তৈরি ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটার পাল্লার ‘অ্যাস্ট্রা মার্ক–২’ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য প্রথমবারের মতো বেসরকারি ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে সুযোগ দিতে চলেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। শীঘ্রই এ বিষয়ে দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে প্রতিরক্ষা সূত্রে জানা গিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রথমত, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর দ্রুত বাড়তে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা। দ্বিতীয়ত, বন্ধুপ্রতিম দেশগুলিতে প্রতিরক্ষা সামগ্রী রফতানি বাড়ানোর কেন্দ্রের পরিকল্পনা। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেড (বিডিএল) একাই উৎপাদনের দায়িত্ব সামলাচ্ছে। কিন্তু দেশীয় চাহিদা এবং সম্ভাব্য রফতানি— দুই ক্ষেত্রেই উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় বেসরকারি শিল্পকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক যে দরপত্র আহ্বান করবে, তাতে দেশের একাধিক বড় শিল্পগোষ্ঠী অংশ নিতে পারে। সম্ভাব্য সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে আইকম, আদানি গোষ্ঠী, ভারত ফোর্জ, টাটা গোষ্ঠী এবং মহীন্দ্রা গোষ্ঠী। এই সংস্থাগুলিকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উৎপাদন পরিকাঠামো এবং মান নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।
অ্যাস্ট্রা মার্ক–২ হল দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দীর্ঘ-পাল্লার ‘বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ’ বা দৃষ্টিসীমার বাইরের আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাল্লা ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে। অর্থাৎ, শত্রু যুদ্ধবিমান চোখে দেখা যাওয়ার আগেই সেটিকে লক্ষ্য করে আঘাত হানতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্র। আধুনিক আকাশযুদ্ধে এই ধরনের অস্ত্রের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
প্রতিরক্ষা সূত্রের মতে, গত বছর ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর আগে পাকিস্তানকে চিন যে দীর্ঘ-পাল্লার পিএল–১৫ই আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছিল, অ্যাস্ট্রা মার্ক–২ তারই কার্যকর জবাব হিসেবে তৈরি হয়েছে। ফলে ভারতীয় বায়ুসেনার আকাশযুদ্ধের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই ক্ষেপণাস্ত্র ধাপে ধাপে ভারতীয় বায়ুসেনার একাধিক যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। তার মধ্যে রয়েছে দেশীয় তেজস মার্ক–১এ, রাশিয়ায় নির্মিত মিগ–২৯ এবং সুখোই–৩০ এমকেআই, পাশাপাশি নৌবাহিনীর জন্য কেনা রাফাল মেরিন যুদ্ধবিমান। ফলে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান একই মানের দীর্ঘ-পাল্লার আকাশযুদ্ধ সক্ষমতা পাবে।
ভারত গত কয়েক বছরে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার উপর বিশেষ জোর দিয়েছে। যুদ্ধবিমান, গোলাবারুদ, কামান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে দেশীয় শিল্পের অংশগ্রহণ বাড়ানোর নীতি নেওয়া হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনেও বেসরকারি শিল্পকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রতিরক্ষা রফতানি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া ইতিমধ্যেই অ্যাস্ট্রা ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে আগ্রহী হতে পারে বলে প্রতিরক্ষা মহলের ধারণা। সেই সম্ভাব্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণ বাড়লে শুধু উৎপাদনের গতি বাড়বে না, প্রতিযোগিতার ফলে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি এবং রফতানির সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি শিল্পের যৌথ উদ্যোগে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন আরও শক্তিশালী হবে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের এই পদক্ষেপকে তাই শুধু একটি শিল্পনীতি নয়, বরং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি, আত্মনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করার কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে।