হাইলাইটস:
- পাঁচটি চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্ট হাতছাড়া করেও প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতলেন লিন্ডা নসকোভা
- অল-চেক ফাইনালে করোলিনা মুচোভাকে হারিয়ে ২১ বছরেই উইম্বলডনের মুকুট
- মায়ের স্মৃতিকে উৎসর্গ করলেন ঐতিহাসিক জয়, চার বছরে তৃতীয় চেক নারী চ্যাম্পিয়ন
উইম্বলডনের সেন্টার কোর্টে তখন যেন সবকিছু ভেঙে পড়ছিল। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে, দর্শকদের গর্জন আরও জোরাল হচ্ছে, আর নিজের ভেতরের আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সেই চাপ সামলাতে চেয়ারে বসে দুই কানে আঙুল গুঁজে চোখ বন্ধ করে ছিলেন লিন্ডা নসকোভা। বাইরে নয়, তিনি লড়ছিলেন নিজের মনের সঙ্গেই।
মাত্র ২১ বছর বয়সী নসকোভা ৬-২, ৫-২ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও টানা পাঁচটি চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্ট নষ্ট করেন। মনে হচ্ছিল, নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হতে চলেছে। স্বদেশি করোলিনা মুচোভা দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে ম্যাচকে তৃতীয় সেটে নিয়ে যান, আর মানসিক লড়াইয়ে এগিয়ে যান তিনিই।
কিন্তু সেখানেই নসকোভা দেখালেন একজন চ্যাম্পিয়নের আসল পরিচয়।
নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিয়ে শেষ সেটে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা, শক্তিশালী সার্ভিস এবং আগ্রাসী বেসলাইন টেনিসের জোরে শেষ পর্যন্ত ৬-২, ৫-৭, ৬-৩ ফলে মুচোভাকে হারিয়ে জিতে নেন জীবনের প্রথম উইম্বলডন এবং প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা।
এই সাফল্যকে অঘটন বলার সুযোগ নেই। জুনিয়র টেনিস থেকেই নসকোভাকে ভবিষ্যতের তারকা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। উইম্বলডনের ঠিক আগে বার্লিনে ডব্লিউটিএ ৫০০ প্রতিযোগিতার শিরোপা জিতে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে ছিলেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টেই তাঁর বিধ্বংসী সার্ভিস এবং আক্রমণাত্মক বেসলাইন খেলা প্রতিপক্ষদের নাস্তানাবুদ করেছে।
তবে এই ট্রফির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই। তৃতীয় রাউন্ডে সোরানা কিরস্তেয়ার বিরুদ্ধে নিজেই ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়ার মুখে পড়েছিলেন নসকোভা। তৃতীয় সেটে ম্যাচ পয়েন্ট বাঁচানোর পর তিনটি ম্যাচ পয়েন্ট নষ্ট করেও টাইব্রেকে ১১-৯ ব্যবধানে জয় তুলে নেন। সেই লড়াইই যেন তাঁকে শিখিয়েছিল—শেষ পয়েন্ট শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও ম্যাচ শেষ হয় না।
ফাইনাল শেষে দেখা যায় এক আবেগঘন মুহূর্ত। দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রাক্তন ডাবলস সঙ্গী আলিঙ্গন করেন একে অপরকে। চোখের জল সামলে মুচোভা মজা করে বলেন, “লিন্ডা, তুমি এখন আমার প্রাক্তন বন্ধু।” দর্শকদের হাসির রোলের মধ্যেই তিনি যোগ করেন, “মজা করলাম। প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনালে তুমি যেভাবে চাপ সামলেছ, তা অসাধারণ। এই ট্রফির পুরো প্রাপ্য তোমার।”
ট্রফি হাতে আরও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন নসকোভা। ২০২৪ সালে ক্যানসারে মারা যাওয়া তাঁর মা ইভানাকে স্মরণ করে তিনি বলেন, “তুমি না থাকলে আমি আজ এখানে দাঁড়াতে পারতাম না।” এরপর আকাশের দিকে তাকিয়ে একটি উড়ন্ত চুম্বন ছুড়ে দেন নতুন উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে উইম্বলডনে চেক টেনিসের আধিপত্য আরও একবার প্রতিষ্ঠিত হল। ২০২৩ সালে মার্কেটা ভন্দ্রুশোভা এবং ২০২৪ সালে বারবোরা ক্রেইচিকোভার পর এবার নসকোভা। চার বছরের মধ্যে তৃতীয় ভিন্ন চেক নারী চ্যাম্পিয়ন পেল অল ইংল্যান্ড ক্লাব। পাশাপাশি ইতিহাসে প্রথমবার কোনও গ্র্যান্ড স্ল্যামের একক ফাইনালে মুখোমুখি হলেন দুই চেক খেলোয়াড়।
এই ঐতিহাসিক ম্যাচ দেখতে রয়্যাল বক্সে উপস্থিত ছিলেন চেক টেনিসের দুই কিংবদন্তি—নয়বারের উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা এবং দু’বারের চ্যাম্পিয়ন পেত্রা কভিতোভা। তাঁদের সামনেই নতুন প্রজন্মের হাতে উঠল আরেকটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম ট্রফি।
প্রথম সেটে নসকোভা ছিলেন প্রায় অপ্রতিরোধ্য। নিখুঁত সার্ভিস, শক্তিশালী ফোরহ্যান্ড এবং ধারাবাহিক আক্রমণে মুচোভাকে কোনও সুযোগই দেননি। কিন্তু ম্যাচের চিত্র বদলাতে শুরু করে ৬-২, ৫-২ অবস্থায় প্রথম চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্টে পৌঁছনোর পর।
মুচোভা একে একে প্রথম তিনটি চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্ট বাঁচিয়ে দেন। এরপর নসকোভার সার্ভিস গেমে শুরু হয় স্নায়ুর লড়াই। একটি চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্টে ডাবল ফল্ট, একের পর এক ফোরহ্যান্ড ভুল এবং টানা চাপ—সব মিলিয়ে পাঁচটি চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্ট হাতছাড়া করেন তিনি। সুযোগ নিয়ে টানা পাঁচটি গেম জিতে ম্যাচকে তৃতীয় সেটে টেনে নিয়ে যান মুচোভা।
শেষ সেটের আগে বাথরুমে গিয়ে নিজেকে শান্ত করেন নসকোভা। ফিরে এসে প্রথম গেমেই তিনটি ব্রেক পয়েন্ট বাঁচান। সেখান থেকেই বদলে যায় ম্যাচের গতি।
এরপর আবার ফিরে আসে তাঁর বিধ্বংসী সার্ভিস, আত্মবিশ্বাসী বেসলাইন খেলা এবং আক্রমণাত্মক টেনিস। আর ষষ্ঠ চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্টে আর কোনও ভুল করেননি তিনি। ঘণ্টায় ১১৫ মাইল গতির দুরন্ত সার্ভিস টি-লাইনে পড়তেই র্যাকেট ছুঁইয়ে উঠতে পারেননি মুচোভা।
একটি সার্ভিস, একটি মুহূর্ত, আর সেখানেই শেষ হয় এক রুদ্ধশ্বাস ফাইনাল। শুরু হয় উইম্বলডনের নতুন রানির রাজত্ব।