হাইলাইটস:

  • বিশ্বকাপ শুরুর আগে আতঙ্ক, বিতর্ক ও রাজনৈতিক উত্তেজনায় ঘেরা ছিল আমেরিকা।
  • ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অভিবাসন নীতি ও ভিসা সমস্যার মধ্যেও দর্শকের রেকর্ড ভিড়।
  • টিভি দর্শকসংখ্যা ও সামাজিক মাধ্যমে আগ্রহ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে।
  • বহুসাংস্কৃতিক আমেরিকার নতুন পরিচয় তুলে ধরেছে বিশ্বকাপের আবহ।

বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর আগে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, আমেরিকা এই টুর্নামেন্টের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর আয়োজক হতে চলেছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, কড়া অভিবাসন নীতি, ভিসা জটিলতা, আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম এবং বাণিজ্যিকীকরণের অভিযোগ—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসবটি হয়তো বিতর্কেই ডুবে যাবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন কানাডাকে আমেরিকার সঙ্গে একীভূত করার হুমকি দিয়েছেন, সহ-আয়োজক মেক্সিকোর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন, আবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতেও জড়িয়ে পড়েছেন। সেনেগাল, আইভরি কোস্ট কিংবা হাইতির সমর্থকদের অনেকেই কঠোর ভিসা নীতির কারণে আমেরিকায় প্রবেশ করতে পারেননি। সেই সঙ্গে ম্যাচের টিকিটের দাম সাধারণ দর্শকের নাগালের বাইরে চলে যায়। এমনকি প্রচণ্ড গরমের অজুহাতে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’-এর সময় টেলিভিশন বিজ্ঞাপন দেখানোর সিদ্ধান্তও সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেকের মতে, এটি ছিল ফুটবলের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে অর্থ উপার্জনের নতুন কৌশল।

কিন্তু মাঠে বল গড়াতেই চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে যায়।

বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যমে দেখতে পান কানায় কানায় ভর্তি স্টেডিয়াম। প্রতিটি ম্যাচ যেন উৎসবে পরিণত হয়েছে। স্পোর্টস বিজনেস জার্নাল-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ৭৮টি ম্যাচে গড়ে ৬৪ হাজার ৫১১ জন দর্শক মাঠে উপস্থিত ছিলেন। অর্থাৎ কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় প্রতি ম্যাচে প্রায় ১০ হাজার বেশি দর্শক। স্টেডিয়ামের আসন পূরণের হার ৯৯.৭ শতাংশ। ফিফার দাবি, ইতিমধ্যেই ৬৫ লক্ষেরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছে।

সবচেয়ে বড় চমক এসেছে আমেরিকার অভ্যন্তরেই। এতদিন যে দেশে ফুটবলকে অন্য খেলাগুলির তুলনায় পিছিয়ে থাকা খেলা হিসেবে দেখা হত, সেই দেশেই এখন বিশ্বকাপ ঘিরে নজিরবিহীন উন্মাদনা। শুধু বিদেশি অভিবাসী বা নির্দিষ্ট দেশের সমর্থকেরাই নন, বিপুল সংখ্যক মার্কিন নাগরিকও বিশ্বকাপের প্রেমে পড়েছেন।

টেলিভিশন দর্শকসংখ্যার পরিসংখ্যান সেই পরিবর্তনেরই প্রমাণ। নিলসেনের হিসাব অনুযায়ী, শেষ ষোলোয় বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে আমেরিকার ম্যাচটি গড়ে ৩ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ দেখেছেন। ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ১০ লক্ষে। এই সংখ্যা গত বছরের ওয়ার্ল্ড সিরিজ কিংবা এনবিএ ফাইনালের পঞ্চম ম্যাচের দর্শকসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

শুধু আমেরিকার ম্যাচ নয়, অন্য দেশগুলির খেলাও বিপুল আগ্রহ নিয়ে দেখছেন মার্কিন দর্শক। ইংল্যান্ড-মেক্সিকো ম্যাচ একাই ২ কোটির বেশি ইংরেজি ভাষার দর্শক এবং আরও ২ কোটির বেশি স্প্যানিশ ভাষার দর্শক টেনেছে। প্রতিযোগিতার প্রথম দিকেই ফক্স চ্যানেলের গড় দর্শকসংখ্যা ৫০ লক্ষ এবং টেলেমুন্ডোর গড় ৪৬ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমেও আগ্রহ তুঙ্গে। জরিপ বলছে, প্রতি দশজন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে চারজন বিশ্বকাপ সংক্রান্ত খবর নিয়মিত অনুসরণ করছেন। অনেকে রেস্তোরাঁ, বার কিংবা উন্মুক্ত প্রেক্ষাগৃহে একসঙ্গে বসে খেলা দেখছেন।

এই উন্মাদনার পিছনে দীর্ঘ প্রস্তুতির ইতিহাসও রয়েছে। ১৯৯৪ সালে আমেরিকা প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। সেই বিশ্বকাপের লাভের অর্থ দিয়েই গড়ে ওঠে দেশের পেশাদার পুরুষ ফুটবল লিগ। ১৯৯৯ সালে মহিলা বিশ্বকাপ এবং পরে আমেরিকার মহিলা দলের সাফল্যও ফুটবলকে জনপ্রিয় করে তোলে। ইউরোপের বড় লিগগুলির সম্প্রচার মার্কিন দর্শকদের কাছে নিয়মিত পৌঁছতে শুরু করলে ফুটবলের অনুরাগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। এখন অনেক মার্কিন সমর্থক ভোরবেলায় উঠে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলও দেখেন।

আরও একটি কারণ এই বিশ্বকাপের সময়সূচি। যেহেতু ম্যাচগুলি উত্তর আমেরিকার সময় অনুযায়ী হচ্ছে, তাই কর্মব্যস্ত মানুষের পক্ষেও রাত জেগে খেলা দেখার প্রয়োজন পড়ছে না। ফলে পরিবার-সহ খেলা দেখার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই মাঠের ফুটবল। প্রতি ম্যাচে গড়ে তিনটি গোল হচ্ছে, যা ১৯৫৮ সালের পর সর্বোচ্চ। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, আর্লিং হালান্ড কিংবা হ্যারি কেনের মতো তারকারা ধারাবাহিকভাবে গোল করছেন। নাটকীয় শেষ মুহূর্তের গোল, অতিরিক্ত সময়ের উত্তেজনা এবং একের পর এক অঘটন বিশ্বকাপকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

বিশ্বকাপের সম্প্রসারিত আসরেও এসেছে নতুন গল্প। ক্ষুদ্র ক্যারিবীয় দেশ কুরাসাও প্রথমবার বিশ্বকাপে গোল করে কোটি মানুষের মন জয় করেছে। কেপ ভার্দের মতো ছোট দেশ নকআউট পর্বে উঠে আর্জেন্টিনাকে চাপে ফেলেছে। এই রূপকথার গল্পগুলি বিশ্বকাপকে আরও মানবিক ও আবেগঘন করে তুলেছে।

তবে পরিসংখ্যানের বাইরেও এই বিশ্বকাপের একটি বড় তাৎপর্য রয়েছে। এমন এক সময়ে, যখন আমেরিকায় অভিবাসন, পরিচয় এবং জাতীয়তাবাদ নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ চলছে, তখন বিশ্বকাপ যেন বহু সংস্কৃতির আমেরিকাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। লস অ্যাঞ্জেলেসে মেক্সিকোর সমর্থক, নিউ ইয়র্কে ইকুয়েডরের সমর্থক, কানসাসে আলজেরিয়ার দলের জন্য স্থানীয় মানুষের উচ্ছ্বাস কিংবা বোস্টনে স্কটল্যান্ডের সমর্থকদের উৎসব—সব মিলিয়ে ফুটবল যেন জানিয়ে দিয়েছে, আমেরিকার আরেকটি মুখও রয়েছে।

নিউ ইয়র্কের এক সমর্থকের কথায়, “এই বিশ্বকাপ মানুষকে আবার একসঙ্গে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন পরিচয়—সবকিছু ভুলে সবাই একসঙ্গে আনন্দ করছে।”

সম্ভবত এটাই ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সাফল্য। রাজনৈতিক বিভাজন, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রশাসনিক কঠোরতার মাঝেও ফুটবল এমন এক মিলনমঞ্চ তৈরি করেছে, যেখানে জাতীয়তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মানুষের যৌথ আনন্দ। বিশ্বকাপ তাই শুধু মাঠের প্রতিযোগিতা নয়; এটি এমন এক আয়না, যেখানে আমেরিকা নিজের আরেকটি, অনেক বেশি উদার ও বহুসাংস্কৃতিক মুখটিও নতুন করে দেখতে পেল।