হাইলাইটস:
- আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ২-০ এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় মিশরের।
- বিতর্কিত রেফারিং নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মিশরীয় ফুটবল সংস্থা।
- তবু দেশে ফিরে নায়কের সম্মান পেলেন সালাহ ও তাঁর সতীর্থরা।
- দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জাতীয় দল মানুষকে ফিরিয়ে দিল বহুদিনের হারানো আনন্দ।
- বিশ্বকাপে মিশরের সাফল্য আফ্রিকা, আরব বিশ্ব ও গাজার মানুষের কাছেও হয়ে উঠেছিল আশার প্রতীক।
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় মঙ্গলবার প্রায় ১৫ মিনিটের জন্য মনে হয়েছিল, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন ঘটতে চলেছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল মিশর। তারও আগে গোলরক্ষক মোস্তাফা শোবেইর লিওনেল মেসির নেওয়া একটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে সমতা ফেরানোর সুযোগ নষ্ট করে দেন। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে যায়। মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা মাত্র ১৩ মিনিটে তিনটি গোল করে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় এবং কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় মিশরের রূপকথার যাত্রা।
নাটকীয় এই পরাজয় মিশরের উল্লাসকে মুহূর্তে বিষাদে পরিণত করে। পরে সেই বিষাদ রূপ নেয় ক্ষোভে। বহু সমর্থকের অভিযোগ, ম্যাচে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার পক্ষেই গিয়েছে। মিশরীয় ফুটবল সংস্থাও রেফারিংয়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
তবু হতাশার মধ্যেও জন্ম নেয় অন্য এক অনুভূতি—গর্ব। আটলান্টা থেকে দল হোটেলে ফিরতেই হাজার হাজার সমর্থক তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। আবেগঘন সেই মুহূর্তে খেলোয়াড়েরা দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে সমর্থকদের অভিনন্দনের জবাব দেন। হৃদয়ভাঙা বিদায়ের পরও এই দলই ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথমবার গোটা জাতিকে একসঙ্গে আনন্দ করার উপলক্ষ এনে দিয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে মিশর আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের বিপুল ব্যয়ে নেওয়া একাধিক বৃহৎ প্রকল্পের ফলে ঋণের বোঝা বেড়েছে, লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং ডলারের তুলনায় স্থানীয় মুদ্রার মান ক্রমাগত কমেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। মজুরি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নাগালের বাইরে চলে গেছে। প্রায় ১১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষের দেশের ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এখনও সরকারের রুটি ভর্তুকি কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল, যা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সবচেয়ে বড় খাদ্য ভর্তুকি ব্যবস্থা।
এমন পরিস্থিতিতে বহু মিশরীয়ের মতো লেখকও স্বীকার করেন, ফুটবলই তাঁদের ক্ষণিকের আনন্দের আশ্রয়। মিশরের ফুটবল ঐতিহ্যও সমৃদ্ধ। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম ছিল দেশটি এবং ১৯৫৭ সালে প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল। সুয়েজ সংকটের পর সদ্য স্বাধীন মিশরের সেই সাফল্য নবজাগ্রত আফ্রিকার আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। রেকর্ড সাতবার আফ্রিকা সেরা হলেও আরব বসন্তের পর আর শিরোপা জেতা হয়নি। সেই সময়ই জাতীয় দলে আত্মপ্রকাশ করেন মোহাম্মদ সালাহ।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পোর্ট সঈদে আল আহলি ও আল মাসরির ম্যাচের পর ভয়াবহ দাঙ্গায় ৭৪ জন নিহত এবং ৫০০-রও বেশি মানুষ আহত হন। কেউ পিটিয়ে, কেউ ছুরিকাঘাতে, আবার কেউ পদদলিত হয়ে প্রাণ হারান। অভিযোগ ওঠে, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা স্টেডিয়ামের দরজা খুলতে অস্বীকার করেছিলেন, ফলে ভেতরে আটকে পড়ে বহু সমর্থক মারা যান। সংসদীয় তদন্তে সমর্থকদের পাশাপাশি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাকেও দায়ী করা হয়। এই ভয়াবহ ঘটনার পর সরকার দুই বছরের জন্য দেশের লিগ বন্ধ করে দেয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জাতীয় দলের ওপরও।
বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে মিশর দু’বার আফ্রিকা কাপের ফাইনালে উঠেছিল—২০১৭ ও ২০২১ সালে। ২০১৯ সালে নিজেদের দেশে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে। সেই আসর আবার ফরোয়ার্ড আমর ওয়ার্দার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগে বিতর্কেও জড়িয়ে পড়ে। এরপর ২০২১ সালে সালাহর নেতৃত্বে ফাইনালে উঠেও সাদিও মানের সেনেগালের কাছে টাইব্রেকারে হারতে হয়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসও এতদিন মিশরের কাছে ছিল হতাশার। ১৯৩৪ সালে প্রথম অংশ নেওয়ার পর গত মাসে নিউজিল্যান্ডকে হারানোর আগে বিশ্বকাপের মঞ্চে একটি ম্যাচও জিততে পারেনি তারা। সেই কারণেই এবারের দলটি বিশেষ। তারা গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোয় পৌঁছায়।
কিন্তু পরিসংখ্যানের বাইরেও এই দলের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল গোটা দেশকে আবার একসঙ্গে আনন্দ করার সুযোগ করে দেওয়া। ম্যাচ জয়ের পর সমর্থকদের সঙ্গে রাস্তায় নেচেছেন ফুটবলাররা। সালাহ হাতে গান বাজানোর যন্ত্র নিয়ে সমর্থকদের সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন। তাঁরা সবাই বুঝিয়ে দিয়েছেন, মিশরের কাছে ফুটবল কখনও শুধু একটি খেলা নয়।
ইউরোপ এবং উত্তর বা দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে থেকে কেবল মিশর ও মরক্কোই শেষ ষোলোয় উঠেছিল। ফলে শুধু নিজের দেশের নয়, গোটা আফ্রিকা এবং আরব বিশ্বের প্রত্যাশাও বহন করছিল মিশর। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির শহিদ চত্বরে অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে হারানোর পর শত শত মানুষ মিশরের পতাকা উড়িয়ে ও গান গেয়ে উৎসব করেন। লেবাননের বিভিন্ন শহরেও মিশর ও লেবাননের পতাকা হাতে নেমে আসে মানুষ।
গাজায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য মিশরের ম্যাচ দেখার বিশেষ ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। গাজার পুনর্গঠন কমিটি বড় পর্দা, বসার ব্যবস্থা এবং বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে জনসমাগমের আয়োজন করে। অনেক শিশু গায়ে জড়িয়ে নেয় মিশরের পতাকা। সালাহ ও তাঁর সতীর্থদের উৎসাহ দিতে ভিড় জমায় অসংখ্য মানুষ। তাঁদের কাছে মিশরের জয় মানেই ছিল নিজেদের জয়। তবে বেদনাদায়ক ঘটনা, আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা পরই ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর হামলায় নিহত হন ওই কমিটির পরিচালক মোহাম্মদ ফাওয়াজ আল-ওয়াহিদি।
অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর ডালাস স্টেডিয়ামে হাতে ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে নিয়েছিলেন মিশরের প্রধান প্রশিক্ষক হোসাম হাসান। তিনি বলেছিলেন, “এই জয় আমি উৎসর্গ করছি মিশরের মানুষ এবং ফিলিস্তিনের মানুষকে—সেই মহান ও সম্মানিত মানুষদের।