হাইলাইটস:

  • ছোটবেলায় গোলকিপার হিসেবেই শুরু করেছিলেন হ্যারি কেন
  • আর্সেনালে স্ট্রাইকারের পাশাপাশি গোলরক্ষক হিসেবেও প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন
  • একাধিকবার প্রত্যাখ্যাত হলেও হার মানেননি, পরিশ্রমেই বদলে দিয়েছেন নিজের ভাগ্য
  • মরিসিও পোচেত্তিনো ও গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনে নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারে পরিণত করেন

বাংলাস্ফিয়ার: ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে হয়তো আরেকটি বাস্তবতাও লেখা থাকতে পারত। সেই বাস্তবতায় হ্যারি কেন দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নন, বরং একজন গোলরক্ষক।

ছয় বছর বয়সে প্রথম ক্লাব রিজওয়ে রোভার্সে যোগ দেওয়ার দিনই সেই সম্ভাবনার জন্ম হয়। কোচ ডেভ ব্রিকনেল জানতে চেয়েছিলেন, গোলপোস্টে দাঁড়াতে কে আগ্রহী? ছোট্ট কেন সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলেছিলেন। আর অবাক করার মতো দক্ষতাও দেখিয়েছিলেন।

ব্রিকনেল পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমি ভেবেছিলাম একজন দুর্দান্ত গোলকিপার পেয়ে গেছি। ওই বয়সে খুব কম শিশুই বলের সামনে দাঁড়াতে রাজি হয়।”

তবে খুব দ্রুতই অন্য অভিভাবকেরা কোচকে জানিয়ে দেন, গোলপোস্টের চেয়ে মাঠে খেললে কেন আরও ভয়ঙ্কর। সেটাই হয়ে ওঠে তাঁর ভবিষ্যতের পথ।

শৈশব থেকেই কেন ছিলেন স্বাভাবিক গোলদাতা। প্রথম মৌসুমেই ৪০টির বেশি গোল করেন তিনি। সেই পারফরম্যান্সে নজর পড়ে আর্সেনালের স্কাউট স্টিভ লিওনার্ডের। শুধু স্ট্রাইকার হিসেবেই নয়, গোলরক্ষক হিসেবেও তাঁর সম্ভাবনা দেখা হয়েছিল। নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি সন্ধ্যায় গোলকিপার কোচ অ্যালেক্স ওয়েলশের কাছেও প্রশিক্ষণ নিতেন কেন।

যাঁরা ছোটবেলায় কেনের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁদের মতে তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল অদম্য মানসিক দৃঢ়তা ও নিজের ওপর অটল বিশ্বাস।

ডেভ ব্রিকনেল বলেন, “হ্যারির সবচেয়ে বড় গুণ তার মানসিক শক্তি। একটা সুযোগ নষ্ট হলেও সে বিচলিত হতো না। কারণ সে জানত, আরেকটা সুযোগ আসবেই। এই মানসিকতাই তাকে এত দূর নিয়ে এসেছে।”

আর্সেনাল তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার পর অনেক তরুণ ফুটবলারের মতো ভেঙে পড়েননি কেন। ফিরে যান রিজওয়ে রোভার্সে। সেখান থেকেই টটেনহ্যাম হটস্পারের স্কাউট মার্ক ও’টুলের নজরে আসেন। একবার টটেনহ্যামও তাঁকে ছেড়ে দেয়। পরে ওয়াটফোর্ডে খেলতে গিয়ে টটেনহ্যামের বিপক্ষে গোল করার পর আবার তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয়।

ব্রিকনেলের মতে, কেনের জীবনে পরিবারের স্থিতিশীল পরিবেশও বড় ভূমিকা রেখেছে।

“দুজন যত্নশীল অভিভাবক সবসময় সঠিক পথ দেখিয়েছেন। জীবনে স্থিরতা ছিল বলেই কঠিন সময়েও সে ভেঙে পড়েনি,” বলেন তিনি।

টটেনহ্যামে প্রথম দলে সুযোগ পাওয়ার আগে কেনকে একের পর এক ধারে অন্য ক্লাবে খেলতে পাঠানো হয়েছিল। সেই সময় অনেকে ভেবেছিলেন, তাঁর আর বড় ফুটবলার হয়ে ওঠা হবে না।

২০১৩ সালে ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ পিটার টেলর তাঁকে বিশ্বকাপের দলে নেন। সেখানে কেনের ফিনিশিং দক্ষতা তাঁকে মুগ্ধ করলেও ভবিষ্যতে তিনি যে বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারদের একজন হয়ে উঠবেন, তা কল্পনাও করতে পারেননি টেলর।

তিনি বলেন, “তখন যদি কেউ জিজ্ঞেস করত, এই ছেলেটা টটেনহ্যামের মূল দলে গিয়ে এমন ক্যারিয়ার গড়বে কি না, আমি বলতাম—আশা করি পারবে, কারণ এর চেয়ে ভালো ছেলে পাওয়া কঠিন। কিন্তু সত্যি বলতে তখন সেটা খুব সম্ভব বলে মনে হয়নি।”

টেলরের আরেকটি স্মৃতিও আজও অমলিন। তুরস্কে দলের মধ্যে বন্ধুত্ব বাড়াতে হোটেলে গলফ পাটিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। সবাই অনুশীলনের পোশাকে এলেও কেন হাজির হন মাথা থেকে পা পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ গলফারের সাজে—টুপি, গ্লাভসসহ।

টেলর হাসতে হাসতে বলেন, “দেখে মনে হচ্ছিল, যেন ব্রিটিশ ওপেনে খেলতে নামছে।”

সেই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের দলে জন স্টোনস ও রস বার্কলির মতো ফুটবলারও ছিলেন। কেন একটি গোল করলেও দল দুটি ম্যাচ ড্র করে এবং একটি হেরে গ্রুপের শেষ স্থানে শেষ করে।

ফেরার পথে জাহাজে কেনের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ হয় টেলরের।

“হ্যারি ছিল অসাধারণ সঙ্গী। ওর মধ্যে নীরব আত্মবিশ্বাস ছিল। কখনও মনে হয়নি, ফুটবল ওর কাছে কিছু পাওনা। বরং ওর বিশ্বাস ছিল—পরিশ্রম করেই নিজের জায়গা তৈরি করবে।”

২০১৩-১৪ মৌসুমে কোচ টিম শেরউড তাঁকে টটেনহ্যামের প্রথম দলে নিয়মিত সুযোগ দেন। মৌসুম শেষ করেন চার গোল নিয়ে।

এরপর মরিসিও পোচেত্তিনোর অধীনে ২০১৪-১৫ মৌসুমেই বিস্ফোরণ ঘটান কেন। ৫১ ম্যাচে করেন ৩১ গোল, যার মধ্যে প্রিমিয়ার লিগেই ছিল ২১টি। পরে তিনবার জেতেন প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেন বুট।

শুরুর দিকে অবশ্য পোচেত্তিনো ও কেনের সম্পর্ক খুব সহজ ছিল না। কেন ভাবতেন, নতুন কোচও হয়তো একাডেমির ফুটবলারদের বদলে নতুন খেলোয়াড় কেনার দিকেই ঝুঁকবেন। অন্যদিকে পোচেত্তিনোও কেনের খেলার ধরনে পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলেন না।

কেন ছিলেন ঐতিহ্যবাহী ধাঁচের স্ট্রাইকার—পিঠ দিয়ে বল আগলে রাখা, বক্সে অপেক্ষা করা এবং সুযোগ কাজে লাগানোই ছিল তাঁর শক্তি। কিন্তু পোচেত্তিনো চাইতেন আধুনিক ফরোয়ার্ড—যিনি সামনে থেকে চাপ সৃষ্টি করবেন, বল কেড়ে নেবেন এবং সারাক্ষণ গতিশীল থাকবেন।

কঠোর অনুশীলন ও ফিটনেস বাড়ানোর নির্দেশ দেন পোচেত্তিনো। কেন সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। এসেক্সে বাড়ি থাকা সত্ত্বেও অনুশীলন কেন্দ্রের কাছে আরেকটি বাড়ি কেনেন, যাতে প্রতিদিন সবার আগে মাঠে পৌঁছাতে এবং সবার শেষে ফিরতে পারেন।

পোচেত্তিনো ২০১৭ সালে প্রকাশিত ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড বইয়ে লিখেছিলেন, “মানসিক দৃঢ়তা, ইচ্ছাশক্তি ও অক্লান্ত পরিশ্রমের বিচারে হ্যারি কেন বিশ্বের সেরা ফুটবলার। তাঁর সমস্ত মনোযোগ শুধু ফুটবলেই।”

অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের হতাশা কাটিয়ে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই তিনি ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তুলেছিলেন।

গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনেও কেন হয়ে ওঠেন ইংল্যান্ড দলের কেন্দ্রবিন্দু। সাউথগেট পুরো আক্রমণভাগ গড়ে তোলেন তাঁকে ঘিরে। ২০১৭ সালে স্ট্রাইকার কোচ হিসেবে অ্যালান রাসেলকে দলে আনেন তিনি।

রাসেলের ভাষায়, “হ্যারির মধ্যে শুরু থেকেই ছিল শান্ত অথচ শক্তিশালী এক ব্যক্তিত্ব। সময়ের সঙ্গে সেটি এমন আত্মবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে, যাকে কোনও পরিস্থিতিই পথচ্যুত করতে পারে না।”

রাসেলের মতে, কিছু খেলোয়াড়কে শেখাতে হয়, আবার কিছু খেলোয়াড়কে চ্যালেঞ্জ জানাতে হয়। হ্যারি কেন ছিলেন দ্বিতীয় ধরনের ফুটবলার—যিনি প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে নিজের উন্নতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।