হাইলাইটস:
- প্রতিপক্ষের উসকানিতেও মাথা ঠান্ডা রেখে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমবাপে।
- পাঁচ ম্যাচে চারটিতে গোল, ফ্রান্সকে টেনে তুলেছেন নকআউট পর্বে।
- ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে দলের সাফল্যকেই দিচ্ছেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব।
- সতীর্থ ও কোচ দিদিয়ের দেশঁর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধনের ভূমিকাও পালন করছেন।
বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৬ বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপে শুধু গোল করেই নয়, নেতৃত্ব দিয়েও ফ্রান্সকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে প্রতিপক্ষের ফুটবলাররা কনুই, স্টাড, ধাক্কা—সব ধরনের উসকানির আশ্রয় নিলেও তিনি শান্ত ছিলেন। হাসিমুখে প্রতিপক্ষকে জবাব দিয়েছেন, আবার সতীর্থদেরও উসকানিতে পা না দিতে উৎসাহিত করেছেন।
ম্যাচ শেষে এমবাপে বলেন, “প্রয়োজনে কঠিন লড়াই আমরাও করতে জানি। নোংরা খেলায় নামতে হলে সেটাও পারি।” তাঁর কথায় স্পষ্ট, ফ্রান্স এখন শুধু সুন্দর ফুটবলই নয়, কঠিন পরিস্থিতিও সামলাতে প্রস্তুত।
মাঠের পারফরম্যান্সেও তিনিই দলের প্রধান ভরসা। প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে ৭০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে জয়সূচক গোল করে ফ্রান্সকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছেন। এর আগে সেনেগাল, ইরাক ও সুইডেনের বিরুদ্ধেও গোল করেছিলেন। পাঁচ ম্যাচে চারটিতে গোল করে তিনি ইতিমধ্যেই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা পারফর্মার।
সেনেগালের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে এমবাপে ফরাসি জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে গেছেন। অলিভিয়ে জিরুকে ছাড়িয়ে এখন তাঁর গোলসংখ্যা ৬৩। কোচ দিদিয়ের দেশঁ তাঁকে “অসাধারণ ফুটবলার” বলে উল্লেখ করে বলেন, “একটি মুহূর্তেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা ওর আছে।”
রিয়াল মাদ্রিদে টানা দুই হতাশাজনক মৌসুম কাটানোর পর এমবাপে এবার বিশ্বকাপে এসেছেন নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করার লক্ষ্য নিয়ে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই তিনি বলেছিলেন, “আমার লক্ষ্য দলকে যতদূর সম্ভব নিয়ে যাওয়া এবং বিশ্বকাপ জেতা।”
২০১৮ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন তিনি। ২০২২ সালে ফাইনালে উঠেও শিরোপা হাতছাড়া হলেও সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জিতেছিলেন। এবার যেন আরও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সুইডেনের বিরুদ্ধে জয়ের পর তাঁর মন্তব্য ছিল, “আমি জানি আমাকে কী করতে হবে।” সতীর্থ লুকাস হার্নান্দেজের ভাষায়, “এমবাপে শতভাগ অনুপ্রাণিত।”
এই বিশ্বকাপে তাঁর মানসিকতাতেও বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে ব্যক্তিগত সাফল্যের দিকে বেশি নজর দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও এখন তিনি বারবার দলের কথাই বলছেন। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে লিওনেল মেসির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়েও তাঁর বক্তব্য, “আমি শুধু দলের উপকার করতে চাই।”
মাঠে সেই মানসিকতার প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে। নরওয়ের বিরুদ্ধে গোল না পেলেও দুটি গোল করিয়েছেন উসমান দেম্বেলেকে। রক্ষণে নেমে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতেও আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম করছেন তিনি।
দেশঁর মতে, অধিনায়ক হিসেবে এমবাপে এখন পূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। কোচের ভাষায়, “কিলিয়ান যখন কথা বলে, পুরো দলের হয়ে কথা বলে। সবাই ওকে অনুসরণ করে।”
মাঠের বাইরেও তাঁর ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ। ১০৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এমবাপে তরুণ ফুটবলারদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেন, তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়ান। ব্র্যাডলি বারকোলা বলেছেন, “কিলিয়ান সব সময় আমাদের পাশে থাকে।” আর জুল কুন্দের মতে, “সে শোনে এবং নিজেই উদাহরণ তৈরি করে।”
কোচ ও ফুটবলারদের মধ্যেও সেতুবন্ধনের কাজ করেন এমবাপে। দেশঁ জানিয়েছেন, খেলোয়াড়দের বিভিন্ন চাওয়া-পাওয়ার কথা অধিনায়কই তাঁর কাছে পৌঁছে দেন, এমনকি সেগুলি এমবাপের নিজের দাবি না হলেও।
এর ফলে তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের স্বার্থপরতার অভিযোগও অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক এক জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ৩৫ শতাংশ ফরাসি তাঁকে বিনয়ী মনে করেন এবং ৭০ শতাংশ ফুটবল সমর্থক মনে করেন তিনি দলকেন্দ্রিক নন। দেশঁ অবশ্য এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “অনেকে এমন একটি জন-ভাবমূর্তি তৈরি করেছে, যার সঙ্গে বাস্তবের কিলিয়ানের কোনও মিল নেই।”
বিশ্বকাপ শুরুর আগে প্রবল চাপের মধ্যেই ছিলেন এমবাপে। সমালোচনা নিয়ে তাঁর জবাবও ছিল রসিকতায় ভরা। তিনি বলেন, “সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতেই যদি খেলতে হয়, তা হলে আমাকে ৮০ বছর পর্যন্ত খেলতে হবে।”
বিশ্বকাপে দুর্দান্ত শুরু করার পর ফ্রান্সের বহু সমর্থকও নিজেদের অবস্থান বদলাতে শুরু করেছেন। “কিলিয়ান, আমাদের ক্ষমা করে দাও”—এই শিরোনামে অনলাইনে একটি আবেদনপত্র চালু হয়েছে, যেখানে সমর্থকেরা স্বীকার করেছেন যে তাঁরা এমবাপেকে নিয়ে ভুল ভেবেছিলেন। ইতিমধ্যেই ৭০ হাজারের বেশি মানুষ সেখানে স্বাক্ষর করেছেন। ফ্রান্স যদি এবার বিশ্বকাপ জিতে ফেলে, সেই সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।