হাইলাইটস:
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৭৫ বছর বয়সের আগে প্রতি ১০ জন ভারতীয়ের একজনের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
- পুরুষদের মধ্যে মুখগহ্বর, ফুসফুস ও খাদ্যনালির ক্যানসার বেশি, আর নারীদের ক্ষেত্রে স্তন, জরায়ুমুখ ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসার উদ্বেগজনক।
- ধূমপান, তামাকজাত দ্রব্য, দূষণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও স্থূলতা ক্যানসারের বড় ঝুঁকির কারণ।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত পরীক্ষা, টিকাকরণ ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে বহু ক্ষেত্রে ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ভারতে ক্যানসার ক্রমশ বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-র সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে একজনের ৭৫ বছর বয়সের আগেই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি ১৫ জনে একজনের এই রোগে মৃত্যুর আশঙ্কাও রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্ত্বেও আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুহার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি)-র তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, গড় আয়ু বেড়ে যাওয়া, নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের মধ্যে মুখগহ্বরের ক্যানসার এখনও সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এর প্রধান কারণ ধূমপান, গুটখা, জর্দা, খৈনি-সহ বিভিন্ন তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার। এর পরেই রয়েছে ফুসফুস, খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর ক্যানসার। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় স্তন ক্যানসার। পাশাপাশি জরায়ুমুখ, ডিম্বাশয় এবং বৃহদন্ত্রের ক্যানসারের প্রকোপও বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যানসারের একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য। ধূমপান ও তামাক সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া, মদ্যপান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। বায়ুদূষণ এবং কর্মক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শও ঝুঁকি বাড়ায়।
ভারতে স্তন ক্যানসারের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। শহরাঞ্চলে এটি নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্ণীত ক্যানসার। দেরিতে সন্তানধারণ, কম সন্তান, স্তন্যপান কম করানো, স্থূলতা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফল চিকিৎসা সম্ভব।
জরায়ুমুখের ক্যানসারও ভারতে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ। অথচ এটি প্রতিরোধযোগ্য ক্যানসারগুলির মধ্যে একটি। মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)-র বিরুদ্ধে টিকাকরণ এবং নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এইচপিভি টিকা নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও এখনও দেশের বহু অঞ্চলে এর নাগাল সীমিত।
পুরুষদের ক্ষেত্রে মুখগহ্বরের ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় অস্ত্র তামাকবিরোধী অভিযান। ভারতে এখনও বিপুল সংখ্যক মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করেন, যার ফলে মুখ, জিভ, মাড়ি ও গলার ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মুখে দীর্ঘদিনের ঘা, সাদা বা লাল দাগ কিংবা গিলতে অসুবিধা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ফুসফুসের ক্যানসারের ক্ষেত্রেও ধূমপান প্রধান কারণ হলেও বায়ুদূষণ একটি ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলিতে দূষিত বায়ুর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ঘরের ভেতরের ধোঁয়া, বিশেষত কঠিন জ্বালানি ব্যবহারকারী পরিবারগুলিতেও ঝুঁকি বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলছে, ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা। অনেক মানুষ উপসর্গকে গুরুত্ব না দিয়ে চিকিৎসা করাতে দেরি করেন। ফলে রোগ ধরা পড়ার সময় তা অনেকটাই ছড়িয়ে যায় এবং চিকিৎসা জটিল হয়ে ওঠে।
ভারতে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ আগের তুলনায় বেড়েছে। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার সুযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবু গ্রামীণ এলাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, উন্নত পরীক্ষা এবং আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবার ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য দূর শহরে যেতে হয়, যার ফলে চিকিৎসা শুরু করতেও দেরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হল সচেতনতা। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অস্বাভাবিক উপসর্গকে অবহেলা না করা, তামাক বর্জন, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রয়োজনীয় টিকাকরণ—এই কয়েকটি পদক্ষেপই হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান ভারতের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। ক্যানসার আর কেবল বয়স্কদের রোগ নয়; তুলনামূলক কম বয়সীদের মধ্যেও এর প্রকোপ বাড়ছে। তাই শুধু উন্নত চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং জনসচেতনতার উপর সমান গুরুত্ব না দিলে আগামী দিনে ক্যানসারের বোঝা আরও ভারী হয়ে উঠবে।