Table of Contents
হাইলাইটস:
- ১৯৮১ সালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর বিজয়োল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন নরওয়ের কিংবদন্তি রেডিও ধারাভাষ্যকার বেয়র্গে লিলিয়েন।
- লর্ড নেলসন থেকে উইনস্টন চার্চিল, লেডি ডায়ানা থেকে মার্গারেট থ্যাচার— একে একে সবার নাম টেনে ব্যঙ্গ করেছিলেন তিনি।
- সেই ধারাভাষ্য আজও নরওয়ের ক্রীড়া-ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত মুহূর্তগুলোর একটি বলে বিবেচিত হয়।
- ইংরেজ ফুটবলের প্রতি নরওয়েজীয়দের গভীর ভালোবাসাই সেই আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার মূল কারণ।
- আজ আবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি ইংল্যান্ড ও নরওয়ে; ১৯৮১ সালের স্মৃতি তাই নতুন করে ফিরে এসেছে।
বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৮১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল নরওয়ে। ফলাফলটি যতটা ঐতিহাসিক ছিল, তার থেকেও বেশি কিংবদন্তি হয়ে ওঠে ম্যাচ শেষের পর নরওয়ের রেডিও ধারাভাষ্যকার বেয়র্গে লিলিয়েনের উচ্ছ্বাস।
তিনি বলেছিলেন, “আমরা ইংল্যান্ডকে হারিয়েছি! দৈত্যদের জন্মভূমি ইংল্যান্ডকে হারিয়েছি!” তারপর এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করেন লর্ড নেলসন, লর্ড বিবারব্রুক, স্যার উইনস্টন চার্চিল, স্যার অ্যান্থনি ইডেন, ক্লেমেন্ট অ্যাটলি, মুষ্টিযোদ্ধা হেনরি কুপার এবং লেডি ডায়ানার নাম। তাঁর রসিক মন্তব্য ছিল— “আজ ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮১-তে এঁদের সবাইকে নরওয়ে হারিয়ে দিল।”
এরপর তিনি হঠাৎ ইংরেজিতে বলে ওঠেন, “ম্যাগি থ্যাচার, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন? আপনার জন্য আমার একটি বার্তা আছে। নিউইয়র্কের বক্সিং বারে যেমন বলা হয়— আপনার ছেলেরা আজ ভয়ানক মার খেয়েছে!”
এই কয়েকটি বাক্যই নরওয়ের ক্রীড়া-সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। ২০০২ সালে দ্য অবজারভার এই ধারাভাষ্যকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রীড়া ধারাভাষ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
কেন এত উচ্ছ্বাস?
ইংল্যান্ড তখন অপরাজেয় দল ছিল না। ১৯৮১ সালেই তারা সুইজারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, স্পেন ও ব্রাজিলের কাছে হেরেছিল। ওয়েলস ও রোমানিয়ার সঙ্গে ড্রও করেছিল। তবু নরওয়ের কাছে ইংল্যান্ডকে হারানো ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য এক স্বপ্নপূরণ।
কারণ, ১৯৬৯ সাল থেকে নরওয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম শীতকালে নিয়মিত ইংল্যান্ডের প্রথম বিভাগের ম্যাচ সরাসরি দেখাত। তখন দেশে মাত্র একটি টেলিভিশন চ্যানেল ছিল। ফলে শনিবার বিকেলে টিভি খুললেই সবাই ইংরেজ ফুটবল দেখতেন।
বর্তমান নরওয়েজীয় ধারাভাষ্যকার ওইভিন্দ আলসাকার বলেন, “বুধবার জানা যেত সপ্তাহান্তে কোন ম্যাচ দেখানো হবে। সবাই উত্তেজনায় অপেক্ষা করত— নিজের প্রিয় দলটিই কি দেখানো হবে?”
১৯৬৯ সালে জন্ম নেওয়া আলসাকার সেই প্রথম প্রজন্মের অংশ, যারা ইংরেজ ফুটবল দেখে বড় হয়েছে। তাঁর কথায়, “আমরা মাঠে নেমে নিজেদের কেভিন কিগান বা জন তোশাক ভেবে খেলতাম।”
অবাক করার মতো ঘটনাও ঘটত। ১৯৭৮ সালে নরওয়েতে সম্প্রচারিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিভাগের ম্যানসফিল্ড বনাম সাউদ্যাম্পটনের ম্যাচ। সেই থেকেই অনেক নরওয়েজীয় অখ্যাত ইংরেজ ক্লাবের সমর্থক হয়ে যান।
এরলিং হালান্ডের প্রপিতামহের ভাই গ্যাব্রিয়েল হয়ল্যান্ড আজও বার্নলির সমর্থক। সাম্প্রতিক ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচের ধারাভাষ্যকার কাসপার উইকেস্তাদ আবার নরউইচ সিটির ভক্ত।
উইকেস্তাদ বলেন, “ইংল্যান্ড ছিল আমাদের স্বপ্নের দেশ। মাঠের শব্দ, দর্শকদের গান, তারকারা— সবকিছুই আমাদের মুগ্ধ করত। মনে হতো, খুব কাছে অথচ আবার অনেক দূরে।”
অসম্ভবকে সম্ভব করার রাত
সেই সময় নরওয়ের জাতীয় দল ছিল দুর্বল। ১৯৩৮ সালের পর তারা বড় কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়ই পৌঁছাতে পারেনি।
উইকেস্তাদের ভাষায়, “ইংল্যান্ড ছিল আমাদের আদর্শ। তাদের হারানো কল্পনারও বাইরে ছিল। তাই সেই জয় আমাদের কাছে অলৌকিক মনে হয়েছিল।”
বেয়র্গে লিলিয়েন নিজেও ছিলেন ব্যতিক্রমী ধারাভাষ্যকার। সাধারণ ম্যাচও তিনি নাটকীয় করে তুলতে পারতেন। অনেক দর্শক টেলিভিশনের শব্দ বন্ধ করে রেডিওতে তাঁর ধারাভাষ্য শুনতেন।
ম্যাচের শেষ দিকে ইংল্যান্ডের ফিল নিল যখন নরওয়ের তারকা টম লুন্ডকে পেছন থেকে ফাউল করেন, লিলিয়েন উত্তেজিত হয়ে তাঁকে “শূকর” বলে বসেন। তাঁর ক্ষোভ ছিল, “ইংরেজদের গ্যালারিতেও গুন্ডা আছে, মাঠেও গুন্ডা আছে।”
অতিরিক্ত সময় বাড়তেই তিনি পোলিশ রেফারি জেরজি কাচপ্রজাককে নিয়েও রসিকতা করেন, “রেফারি সময় বাড়িয়েই চলেছেন। মনে হচ্ছে ইংল্যান্ডের নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করছেন!”
এরপরই শেষ বাঁশি বাজে।
লিলিয়েন চিৎকার করে ওঠেন, “নরওয়ে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়েছে! আমরা বিশ্বের সেরা!”
এই কয়েকটি বাক্যই পরবর্তী কয়েক দশকে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়।
ইংরেজ ফুটবলের প্রেম আজও অটুট
চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নরওয়েজীয়দের ইংরেজ ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। এখনও বহু নরওয়েজীয় শিশু বার্সেলোনা বা রিয়াল মাদ্রিদের বদলে ইংল্যান্ডে খেলার স্বপ্ন দেখে।
আলসাকার বলেন, “টানা তিন প্রজন্ম ধরে নরওয়েজীয়রা যেন শিরায় শিরায় ইংরেজ ফুটবল পেয়েছে।”
এবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আবার মুখোমুখি ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। সেই ম্যাচের ধারাভাষ্য দেবেন আলসাকারই।
তিনি বলেন, **“গত ২৫ বছরে নরওয়ে দলকে যতটা দেখেছি, তাতে এখান পর্যন্ত পৌঁছনোই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। শেষ ষোলোয় ওঠাই বড় সাফল্য ভেবেছিলাম। এখন আমরা বিশ্বকাপের সেরা চার দলে ওঠার লড়াই খেলছি। এই মুহূর্তের গুরুত্ব আমি গভীরভাবে অনুভব করছি। আশা করি, দেশের মানুষের সেই আবেগ ঠিকভাবে পৌঁছে দিতে পারব।”