নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি: আবার হামলা হলে ‘প্রচণ্ড শক্তি’ দিয়ে জবাব
হাইলাইটস
- ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপের পর আপাতত হামলা বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে ইজরায়েল ও ইরান।
- প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তেহরান নতুন করে হামলা চালালে ইজরায়েল আরও শক্তিশালী জবাব দেবে।
- লেবাননে হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে ইজরায়েলি হামলার জেরেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ শুরু হয়েছিল।
- পরিস্থিতি আপাতত শান্ত হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত নড়বড়ে।
- সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আরেক দফা সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা আপাতত কিছুটা কমেছে। ইজরায়েল ও ইরান উভয়েই জানিয়েছে যে তারা আপাতত একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা বন্ধ রেখেছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের, যিনি প্রকাশ্যে দুই দেশকে অবিলম্বে গোলাগুলি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সোমবার রাতে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু স্বীকার করেন যে এই মুহূর্তে সংঘর্ষ থেমে রয়েছে। তবে একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দেন, ইরান যদি আবার হামলার পথ বেছে নেয়, তাহলে ইজরায়েল আরও কঠোর ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া জানাবে।
নেতানিয়াহু বলেন, “এই মুহূর্তে এই ফ্রন্টে আগুন থেমে রয়েছে। কারণ তেহরানের সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে আঘাত করার পর তারা আমাদের ওপর হামলা বন্ধ করেছে। কিন্তু তারা যদি আবার সেই ভুল করে, তাহলে আমরা প্রবল শক্তি দিয়ে জবাব দেব।”
গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথমবার এত বড় আকারে সরাসরি মুখোমুখি হয়েছিল দুই দেশ। রবিবার রাতে ইরান একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইজরায়েলের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করার চেষ্টা করে। তার জবাবে ইজরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালায়।
সংঘাত আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরাও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে। শুধু তাই নয়, তারা লোহিত সাগরে ইজরায়েল-সংযুক্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দেয়। ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন যুদ্ধবিরতি আসলে “যুদ্ধবিরতির মধ্যে আরেক যুদ্ধবিরতি” মাত্র। অর্থাৎ পরিস্থিতি এতটাই অস্থির যে যে কোনও মুহূর্তে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা বিমান আক্রমণ শুরু হতে পারে।
সংঘাতের অন্যতম বড় কারণ লেবানন। ইজরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আসছে। ইরান বহু বছর ধরে হিজবুল্লাহকে অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সমর্থন করে। ফলে লেবাননে ইজরায়েলি হামলাকে তেহরান নিজের বিরুদ্ধে আক্রমণের সমতুল্য বলে মনে করে।
সোমবার ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। তিনি বলেন, “হিজবুল্লাহ যদি ইজরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালায়, তাহলে বৈরুতও রেহাই পাবে না। ইরান যদি লেবাননকে সামনে রেখে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন আক্রমণের চেষ্টা করে, তবে তার ফলও একই হবে।”
রবিবার বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠে, যা হিজবুল্লাহর অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানে ইজরায়েলের বিমান হামলার পরই ইরান ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ শুরু করেছিল।
অন্যদিকে ইরানও কোনও নরম অবস্থান নেয়নি। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার এবং অন্যতম প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “বিশ্বাস স্থাপনের প্রকৃত ইচ্ছা না থাকলে ইরানের প্রতিক্রিয়াও একই থাকবে।” তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে তেহরান আপাতত হামলা বন্ধ রাখলেও আত্মসমর্পণের কোনও প্রশ্নই নেই।
এই পরিস্থিতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইজরায়েলকে লেবাননে হামলা কমানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছেন, যাতে ইরানের সঙ্গে একটি বৃহত্তর শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত সপ্তাহে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপে ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। সোমবারও তিনি দাবি করেন, তিনি ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করে বলেছেন, “বিবি, সাবধানে চলুন। না হলে খুব শিগগিরই আপনাকে একাই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।”
কিন্তু নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানও জটিল। এ বছরই ইজরায়েলে নির্বাচন হওয়ার কথা। দেশীয় রাজনীতিতে তিনি প্রবল চাপের মুখে রয়েছেন। অনেকেই মনে করেন, হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি সম্পূর্ণ ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে জনমতের একটি বড় অংশ রয়েছে।
এদিকে সোমবারও উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি। উত্তর ইজরায়েলের দিকে হিজবুল্লাহর নতুন রকেট নিক্ষেপের খবর পাওয়া যায়। একইসঙ্গে দক্ষিণ লেবাননের টাইর শহরের কাছে ইজরায়েলি হামলারও খবর আসে।
ইজরায়েলের সাম্প্রতিক আক্রমণে ইরানের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তারা ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে মোতায়েন করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারও বড় অংশ ধ্বংস করেছে। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরান, তাবরিজ, ইসফাহান ও কারাজে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইরানের সামরিক সদর দপ্তর দাবি করেছে, লেবাননে ইজরায়েলি হামলার জবাবে তারা “যন্ত্রণাদায়ক প্রতিক্রিয়া” দিয়েছে। ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের দাবি, তারা ইজরায়েলের দুটি সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
এই সংঘাত শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। যুদ্ধের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম একদিনেই প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে যায়। তবে যখন স্পষ্ট হয় যে উভয় পক্ষ আপাতত হামলা বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে, তখন শেয়ারবাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়।
তবু শান্তির পথ এখনও দীর্ঘ। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল এবং যার ফলে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন, তার ক্ষত এখনও গভীর। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি শুধু বড় আকারের সংঘর্ষ থামিয়েছিল; উত্তেজনা কখনও পুরোপুরি দূর হয়নি।
সোমবার ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “ইজরায়েল এবং ইরান দু’পক্ষই অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি চায়। স্থায়ী শান্তি নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে, যদি না অজ্ঞতা বা বোকামি তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।”
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বলে, এই অঞ্চলে শান্তি যত দ্রুত আসে, তত দ্রুতই তা ভেঙেও যায়। ফলে আপাতত গোলাগুলি থামলেও যুদ্ধের ছায়া এখনও পুরোপুরি সরেনি। বরং বলা যায়, বিস্ফোরক পরিস্থিতির উপর এখন শুধু একটি পাতলা শান্তির আবরণ চাপানো রয়েছে।