হাইলাইটস:

  • বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই তৃণমূলে অভূতপূর্ব অন্তর্দ্বন্দ্ব।
  • ‘ভুয়ো স্বাক্ষর’ বিতর্ক ঘিরে একাধিক বিধায়ক ও সাংসদের বিদ্রোহ প্রকাশ্যে এসেছে।
  • দলের ভিতরে ভাঙন ঠেকাতে সংগঠন পুনর্গঠন করতে বাধ্য হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
  • রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা করার কৌশল নিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী।
  • হকার উচ্ছেদ, বিরোধী দমন এবং কেন্দ্র-রাজ্যের সংঘাতকে রাজনৈতিক ইস্যা হিসেবে তুলে ধরছেন তিনি।

বাংলাস্ফিয়ার: বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেস আজ অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে। একদিকে বিজেপির নতুন সরকার প্রশাসনিক স্তরে দ্রুত পদক্ষেপ করছে, অন্যদিকে দলের ভিতরে বিদ্রোহ, দলত্যাগ এবং নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৃণমূলকে রীতিমতো নাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতেই আবার পুরনো পরিচিত ভূমিকায় ফিরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—রাজপথের আন্দোলনকারী নেত্রী হিসেবে।

পরাজয়ের পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে অসন্তোষ জমতে শুরু করে। বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে ‘স্বাক্ষর জালিয়াতি’ বিতর্ক দলকে অস্বস্তিতে ফেলে। দুই বিধায়কের অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া ঘটনা ক্রমে বড় রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়। একের পর এক বিধায়ক প্রকাশ্যে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এমনকি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবি করতে শুরু করে।

সংকট এতটাই গভীর হয় যে তৃণমূল নেতৃত্ব সমস্ত সাংগঠনিক কমিটি ও শাখা সংগঠন ভেঙে দিয়ে নতুন করে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। পরে দলীয় রদবদল করে নতুন মুখকে সামনে আনার চেষ্টা করা হয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপ আসলে ভাঙন ঠেকানোর মরিয়া চেষ্টা।

লোকসভাতেও পরিস্থিতি সুখকর নয়। একদল বিদ্রোহী সাংসদ আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে খবর। তাঁদের দাবি, তাঁরা ‘আসল তৃণমূল’-এর প্রতিনিধিত্ব করছেন। এর বিরুদ্ধে সরাসরি লোকসভার স্পিকারের কাছে চিঠি দিতে হয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ঘটনাটি প্রমাণ করে যে সংকট শুধু বিধানসভা বা সংগঠনে সীমাবদ্ধ নয়, সংসদীয় দলেও তার প্রভাব পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝেছেন, সাংগঠনিক বৈঠক দিয়ে কর্মীদের মনোবল ফেরানো সম্ভব নয়। তাই তিনি আবার আন্দোলনের রাজনীতি বেছে নিয়েছেন। জুনের শুরুতেই তিনি কলকাতায় ধর্নায় বসেন। অভিযোগ করেন, প্রশাসনিক শক্তি ব্যবহার করে তৃণমূলকে ভাঙার চেষ্টা চলছে। তাঁর বক্তব্য, এটি শুধু একটি দলের বিরুদ্ধে নয়, বিরোধী রাজনীতিকে নিশ্চিহ্ন করার বৃহত্তর পরিকল্পনা।

এরপর হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে তিনি সরাসরি পথে নামেন। কলকাতার ফুটপাত ও হকার প্রশ্ন বহুদিন ধরেই মমতার রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ। নব্বইয়ের দশকে বামফ্রন্টের ‘অপারেশন সানশাইন’-এর বিরুদ্ধেও তিনি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এবারও সেই আবেগকে কাজে লাগিয়ে তিনি উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পিছনে তিনটি স্পষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, কর্মী-সমর্থকদের বার্তা দেওয়া যে নেতৃত্ব এখনও লড়াইয়ের ময়দানে আছে। দ্বিতীয়ত, দলের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ থেকে জনদৃষ্টি সরিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করা। তৃতীয়ত, বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ গড়ে তোলার চেষ্টা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের বড় শক্তি ছিল রাস্তায় নেমে আন্দোলন করার ক্ষমতা। ক্ষমতায় থাকাকালীন সেই চরিত্র কিছুটা আড়ালে চলে গিয়েছিল। এখন ক্ষমতা হারানোর পর তিনি আবার সেই পুরনো রাজনৈতিক অস্ত্রই ব্যবহার করছেন। কারণ তিনি জানেন, তৃণমূলের বর্তমান সংকটের সমাধান কেবল সংগঠনগত নয়, মনস্তাত্ত্বিকও। কর্মীদের বিশ্বাস করাতে হবে যে লড়াই এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

সেই কারণেই আজ তৃণমূলে ভাঙনের আবহে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার পথে। রাজপথই তাঁর সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক মঞ্চ, আর সেখান থেকেই তিনি দলকে পুনর্গঠনের শেষ চেষ্টা চালাচ্ছেন।