নেতাজি-বিতর্কে অনন্ত মহারাজের ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রত্যাহার করল রাজ্য

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যের জেরে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজের ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান প্রত্যাহার করল…
- রাজ্যের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মানটি বাতিল করে বৃহস্পতিবার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর।
- নিজের দলের সাংসদের বিরুদ্ধে বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যের জেরে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজের ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান প্রত্যাহার করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মানটি বাতিল করে বৃহস্পতিবার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর। নিজের দলের সাংসদের বিরুদ্ধে বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের বিশেষ কমিশনার তথা অধিকর্তা কৌশিক বসাকের স্বাক্ষরিত নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজের কাছে বঙ্গবিভূষণ সম্মান থাকা ওই পুরস্কারের ‘মর্যাদা, গৌরব ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ’। সেই কারণেই তাঁকে দেওয়া সম্মান প্রত্যাহার ও বাতিল করা হচ্ছে। তবে নির্দেশিকায় সরাসরি নেতাজি-বিতর্ক বা সাংসদের নির্দিষ্ট মন্তব্যের উল্লেখ করা হয়নি।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, এখন থেকে অনন্ত মহারাজ নিজেকে বঙ্গবিভূষণপ্রাপ্ত বলে পরিচয় দিতে পারবেন না। এই সম্মানের সূত্রে কোনও স্বীকৃতি, সুযোগ-সুবিধা বা বিশেষ অধিকারও তিনি দাবি করতে পারবেন না। গত ২১ ফেব্রুয়ারি, বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে, তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার অনন্ত মহারাজকে বঙ্গবিভূষণ দিয়েছিল। রাজবংশী সমাজে তাঁর প্রভাবের কথা মাথায় রেখে সেই সিদ্ধান্তের পিছনে রাজনৈতিক হিসাবও ছিল বলে তখন বিরোধীরা অভিযোগ করেছিল।
সম্প্রতি অনন্ত মহারাজ নেতাজিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে উল্লেখ করেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ সংগঠনের ক্ষেত্রে নেতাজির ভূমিকা এবং সামরিক দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, নেতাজি নিজে আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তোলেননি। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর যে সৈন্যেরা বন্দি হয়েছিলেন, জার্মানি তাঁদের নেতাজির হাতে তুলে দিয়েছিল এবং তাঁদের নিয়েই বাহিনী তৈরি হয়েছিল। নেতাজি আজাদ হিন্দ ফৌজকে ‘অপব্যবহার’ করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন সাংসদ। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ওই বাহিনীর অবদান নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই পশ্চিমবঙ্গজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিজেপির অন্দরেও অনন্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত সাংসদের ইতিহাসজ্ঞান নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেন। বিজেপির বহু নেতা মনে করেন, রাজবংশী ভোটে অনন্তের প্রভাব থাকলেও তাঁর মন্তব্যে সারা রাজ্যে দলের যে রাজনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বুধবারই জানিয়ে দিয়েছিলেন, নেতাজিকে অসম্মান করলে সাংসদ, বিধায়ক, মন্ত্রী কিংবা সরকারি আধিকারিক—কাউকেই রেয়াত করা হবে না। আইন সকলের ক্ষেত্রে সমান বলে মন্তব্য করে তিনি পুলিশ ও সাইবার অপরাধ দমন শাখাকে সমাজমাধ্যমে নেতাজি-বিরোধী মন্তব্য, এমনকি সেই ধরনের লেখায় সমর্থনসূচক প্রতিক্রিয়াও চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ও প্রাসঙ্গিক তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা দায়ের এবং প্রয়োজনে গ্রেফতার করার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিতর্কের মধ্যেই অনন্ত মহারাজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের নেতা কিরণকুমার দাসকে উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়া থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সমাজমাধ্যমে নেতাজিকে বিদ্রুপ করা এবং তাঁর অন্তর্ধান নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই লেখা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। রাজ্যজুড়ে নেতাজিকে অবমাননা করা অন্তত ১০৭টি সমাজমাধ্যমের লেখা সরানো হয়েছে; দায়ের হয়েছে আটটি মামলা।
তবে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের পরেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি অনন্ত মহারাজ। দিল্লিতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তাঁর বক্তব্য কোনও ব্যক্তিগত কল্পনা নয়, তার নথিভিত্তিক প্রমাণ জাতীয় মহাফেজখানায় রয়েছে। সেই নথির সত্যতা সম্পর্কে কংগ্রেসের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত বলেও দাবি করেন তিনি। নেতাজি নিজে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেননি—এই বক্তব্যও পুনরাবৃত্তি করেন সাংসদ। তাঁর আরও দাবি, জওহরলাল নেহরুও নেতাজিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলেছিলেন; সে ক্ষেত্রে নেহরুর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অনন্ত মহারাজ রাজবংশী সমাজের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এবং পৃথক কোচবিহার বা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনকারী সংগঠনের একটি বড় অংশের প্রধান। পশ্চিমবঙ্গে রাজবংশী ভোটারের সংখ্যা আনুমানিক ১৮ থেকে ২০ লক্ষ। বিজেপি ও তৃণমূল—উভয় দলই দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে উত্তরবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছে। ফলে তাঁর সম্মান প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত শুধু নেতাজির মর্যাদা রক্ষার প্রশাসনিক বার্তা নয়, রাজনৈতিক ক্ষতি সামলাতে বিজেপির কঠোর পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে সমস্ত সরকারি দফতর ও বিদ্যালয়ে নেতাজির প্রতিকৃতি রাখা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিধায়কদের সেবাকেন্দ্রগুলিও নেতাজির নামে করার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বাধীনতা দিবসের মুখে অনন্ত মহারাজের সম্মান প্রত্যাহার করে সরকার স্পষ্টতই বোঝাতে চাইল—নেতাজিকে কেন্দ্র করে কোনও আপসের অবকাশ নেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



