Table of Contents
হাইলাইটস:
- ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূলের সংকট আর শুধু সাংসদ-বিধায়কদের বিদ্রোহে সীমাবদ্ধ নয়।
- নিচুতলার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সিন্ডিকেট রাজ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসছে।
- অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবক্ষেত্র বলে পরিচিত এলাকাতেও সংগঠনের ভিত নড়বড়ে।
- কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হুগলি, বর্ধমান-সহ একাধিক জেলায় কর্মীদের একাংশ দূরত্ব বাড়াচ্ছেন।
- ক্ষমতায় থাকাকালীন জমে থাকা অসন্তোষ এখন বিস্ফোরিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সংকটকে এতদিন অনেকেই কেবল শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্কট হিসেবে দেখছিলেন। সাংসদদের বিদ্রোহ, বিধায়কদের দলবদল, বিরোধী দলনেতা নিয়ে বিতর্ক কিংবা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক চাপ—এসবই ছিল সংবাদ শিরোনামে। কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত একটি বিশদ প্রতিবেদনের ইঙ্গিত, সমস্যাটা তার চেয়েও গভীর। ভাঙন শুধু উপরে নয়, নিচেও। দলের ঘাসের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে অসন্তোষের ঢেউ।
তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনকালে যেসব সমস্যা বারবার বিরোধীরা তুলে ধরেছিল—সিন্ডিকেট রাজ, কাটমানি, স্থানীয় নেতাদের দাপট, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, তোলাবাজির অভিযোগ—ক্ষমতায় থাকার সময় সেগুলি অনেকাংশে চাপা পড়ে ছিল। কারণ ক্ষমতা ছিল দলের হাতে। প্রশাসন, পঞ্চায়েত, পুরসভা—সব জায়গায় কর্তৃত্ব থাকায় ক্ষুব্ধ কর্মীরাও মুখ খুলতেন না। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পরে সেই চাপা ক্ষোভ একে একে প্রকাশ্যে আসছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই ক্ষোভ কেবল বিরোধী শিবিরে চলে যাওয়া নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বহু সাধারণ কর্মী, বুথস্তরের সংগঠক এবং পুরনো সমর্থকেরাও এখন প্রশ্ন তুলছেন, কেন দল মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে গেল।
সিন্ডিকেট প্রশ্নে ক্ষোভের বিস্ফোরণ
তৃণমূলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল তথাকথিত সিন্ডিকেট সংস্কৃতি। বাড়ি তৈরি থেকে ব্যবসা, জমি কেনাবেচা থেকে সরকারি প্রকল্প—সব ক্ষেত্রেই কিছু স্থানীয় গোষ্ঠীর আধিপত্য নিয়ে অভিযোগ ছিল।
দলের বহু কর্মী মনে করেন, এই সিন্ডিকেট রাজই শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের ভাবমূর্তিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দলের দূরত্ব বেড়েছে। বহু জায়গায় দলীয় কর্মীরা নিজেদের এলাকায় মানুষের রোষের মুখে পড়েছেন, অথচ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অন্যরা।
একজন পুরনো সংগঠক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে বলেছেন, মানুষ শুধু বিরোধীদের প্রচারে প্রভাবিত হয়নি; তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সেই ক্ষোভ ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে।
অভিষেকের রাজনৈতিক গড়েও অস্বস্তি
প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকাতেও অসন্তোষের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।
একসময় যেসব এলাকাকে তৃণমূলের সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটি বলে মনে করা হত, সেখানে এখন কর্মীদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। অনেকের অভিযোগ, সংগঠনের ভিতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। নিচুতলার কর্মীদের মতামত গুরুত্ব পায়নি।
ক্ষমতায় থাকাকালীন যাঁরা দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কিছু বলতে সাহস পেতেন না, এখন তাঁরাই প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন। কেউ কেউ আবার সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনও দলের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ। কারণ নেতৃত্বের বিদ্রোহ সামাল দেওয়া তুলনামূলক সহজ; কিন্তু কর্মীস্তরে উৎসাহ হারিয়ে গেলে সংগঠন পুনর্গঠন অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
কলকাতার সংগঠনেও ক্লান্তির ছাপ
তৃণমূলের শহুরে শক্তির কেন্দ্র ছিল কলকাতা। পুরসভা, ওয়ার্ড কমিটি, স্থানীয় ক্লাব এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে দল দীর্ঘদিন শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল।
কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর সেই নেটওয়ার্কে ফাটল দেখা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় কর্মীরা আর আগের মতো সক্রিয় নন। সভা-মিছিলে উপস্থিতি কমছে। কিছু এলাকায় নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বও বেড়েছে।
দলের একাংশের অভিযোগ, ক্ষমতায় থাকাকালীন যাঁরা সুবিধা ভোগ করেছেন, তাঁরা এখন সংগঠনকে বাঁচানোর লড়াইয়ে সামনে আসছেন না। ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
বর্ধমানে নতুন সমীকরণ
বর্ধমান জেলা দীর্ঘদিন তৃণমূলের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি ছিল। কৃষক, শ্রমিক এবং গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্কের উপর ভিত্তি করে সেখানে শক্তিশালী সংগঠন তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বর্ধমানের বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কর্মীদের মধ্যে অস্বস্তি বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেককে চিন্তায় ফেলেছে।
বিশেষ করে ক্ষমতা হারানোর পর প্রশাসনিক প্রভাব কমে যাওয়ায় বহু নেতা-কর্মী নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে হিসাব কষতে শুরু করেছেন।
ক্ষমতা হারানোর মানসিক অভিঘাত
যে কোনও রাজনৈতিক দলের জন্য দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর পরাজয় একটি বড় ধাক্কা। তৃণমূলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
ক্ষমতায় থাকার সময় সংগঠনের অনেক সমস্যা চাপা থাকে। কারণ সবাই জানে, শেষ পর্যন্ত সরকার দলেরই। কিন্তু ক্ষমতা চলে গেলে সেই আচ্ছাদন সরে যায়। তখন প্রকাশ্যে আসে প্রকৃত শক্তি ও দুর্বলতা।
তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বাস্তবতাই স্পষ্ট হচ্ছে। দলের ভেতরে বহুদিনের জমে থাকা অভিযোগ, ক্ষোভ এবং হতাশা এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
মমতার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নেতা মমতা বন্দোপাধ্যায় অতীতেও একাধিক রাজনৈতিক সংকট সামলেছেন। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০১৯ সালের ধাক্কা—প্রতিবারই তিনি সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
কিন্তু বর্তমান সংকটের চরিত্র ভিন্ন।
এবার সমস্যা কেবল বিরোধীদের আক্রমণ নয়। সমস্যা দলের ভেতরেও। সাংসদদের বিদ্রোহ, বিধায়কদের অসন্তোষ, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং নিচুতলার কর্মীদের হতাশা—সব মিলিয়ে এটি বহুস্তরীয় সংকট।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধুমাত্র আবেগঘন আহ্বান বা সাংগঠনিক রদবদল দিয়ে এই সংকট কাটানো কঠিন হবে। দলের মধ্যে আত্মসমালোচনার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। কেন মানুষ দূরে সরে গেল, কেন কর্মীরা ক্ষুব্ধ হলেন, কেন সিন্ডিকেট ও স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্রগুলি এত শক্তিশালী হয়ে উঠল—সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
আগামী লড়াই সংগঠনের ভিত রক্ষার
তৃণমূলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় লড়াই বিজেপি বা অন্য কোনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়; বরং নিজেদের সংগঠনের ভিত রক্ষা করা।
যদি নিচুতলার কর্মীরা দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে কোনও রাজনৈতিক পুনরুত্থানই সহজ হবে না। আর যদি নেতৃত্ব এই অসন্তোষকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন করে সংগঠন গড়ে তুলতে পারে, তাহলে সংকট কাটানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনের মূল বার্তা স্পষ্ট—তৃণমূলের সমস্যার কেন্দ্র আর শুধু কলকাতার শীর্ষ নেতৃত্বের ঘরে সীমাবদ্ধ নেই। সেই কম্পন পৌঁছে গেছে গ্রাম, পাড়া, বুথ এবং কর্মীস্তর পর্যন্ত। আর কোনও রাজনৈতিক দলের জন্য সেটাই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।