হাইলাইটস
- ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিরোধী ঐক্যের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল INDIA জোট।
- কিন্তু শুরু থেকেই জোটের ভিতরে ছিল নেতৃত্ব, আসন বণ্টন ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সংঘাত।
- সমালোচকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সিদ্ধান্তই জোটকে সবচেয়ে বেশি দুর্বল করেছে।
- তবে এই ব্যর্থতার দায় কি শুধু দুই নেতার, নাকি গোটা বিরোধী রাজনীতির কাঠামোগত সমস্যার ফল?
ভারতের বিরোধী রাজনীতির ইতিহাসে INDIA জোট এক সময় ছিল বিরাট এক রাজনৈতিক পরীক্ষার নাম। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট— বিজেপির বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আঞ্চলিক দল, জাতীয় দল এবং মতাদর্শগতভাবে ভিন্ন শক্তিগুলিকে এক ছাতার নিচে এনে একটি বিকল্প রাজনৈতিক মেরু তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল।
কিন্তু যে জোটকে একসময় বিজেপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই সেই জোট আজ কার্যত অস্তিত্ব সংকটে। একের পর এক শরিক দূরে সরে যাচ্ছে, পারস্পরিক অভিযোগ বাড়ছে, এবং জোটের বৈঠকগুলোও ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিরোধী রাজনীতির অনেক পর্যবেক্ষক একটি বিতর্কিত মন্তব্য করছেন— “INDIA জোটকে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন দুই নেতা: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অরবিন্দ কেজরিওয়াল।”
এই মন্তব্যের পেছনে যুক্তি কী?
প্রথমেই আসা যাক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গে।
বিরোধী ঐক্যের প্রশ্নে মমতা শুরু থেকেই ছিলেন এক দ্বৈত অবস্থানের প্রতীক। একদিকে তিনি বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির অন্যতম মুখ, অন্যদিকে কংগ্রেসকে কখনওই স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে দেখতে চাননি।
পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস এবং সিপিএমের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘর্ষ রয়েছে। ফলে দিল্লিতে এক মঞ্চে বসা আর রাজ্যে বাস্তব সমঝোতা করা— এই দুইয়ের মধ্যে বিরাট ফারাক ছিল।
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে কার্যত এককভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত নেয় তৃণমূল। কংগ্রেসকে ন্যূনতম আসন দেওয়ার প্রস্তাব এবং পরে প্রায় সম্পূর্ণ একক লড়াইয়ের পথ বেছে নেওয়া INDIA জোটের ঐক্যের বার্তাকে বড় ধাক্কা দেয়।
শুধু তাই নয়, একাধিকবার মমতা প্রকাশ্যে এমন মন্তব্য করেন, যাতে কংগ্রেসের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কখনও তিনি নিজেকে সম্ভাব্য সমন্বয়কারী হিসেবে তুলে ধরেন, কখনও আবার বিকল্প নেতৃত্বের ইঙ্গিত দেন।
ফলে বিরোধী শিবিরের ভিতরেই সন্দেহ জন্মায়— মমতা কি সত্যিই একটি শক্তিশালী সর্বভারতীয় জোট চান, নাকি নিজের রাজনৈতিক পরিসরকে সর্বাধিক বিস্তৃত করতে চান?
অন্যদিকে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ভূমিকাও কম বিতর্কিত নয়।
আম আদমি পার্টির উত্থান মূলত কংগ্রেসের ভোটভিত্তি ভেঙে। দিল্লি, পাঞ্জাব, গুজরাট বা গোয়ার মতো রাজ্যে আপের বিস্তার অনেক ক্ষেত্রেই কংগ্রেসের রাজনৈতিক জায়গা সংকুচিত করে হয়েছে।
ফলে INDIA জোটের অংশ হয়েও কেজরিওয়াল কখনও কংগ্রেসের সঙ্গে পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি।
দিল্লিতে আসন বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েন, পাঞ্জাবে কংগ্রেসকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা এবং বিভিন্ন রাজ্যে সংগঠন বিস্তারের আগ্রাসী কৌশল জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে দুর্বল করেছে।
সমালোচকদের মতে, কেজরিওয়াল বিজেপির বিরুদ্ধে যতটা লড়েছেন, অনেক সময় তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক শক্তি ব্যয় করেছেন কংগ্রেসকে প্রতিহত করতে।
ফলে INDIA জোটের ভেতরে বিশ্বাসের সংকট আরও গভীর হয়েছে।
তবে পুরো দায় কি শুধুই এই দুই নেতার?
বাস্তবতা সম্ভবত আরও জটিল।
INDIA জোটের জন্মই হয়েছিল এক ধরনের নেতিবাচক ঐক্যের ভিত্তিতে— বিজেপিকে হারানোর লক্ষ্যে। কিন্তু বিজেপির বিকল্প হিসেবে দেশকে কী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক দর্শন দেওয়া হবে, সে বিষয়ে জোটের মধ্যে কখনও সুস্পষ্ট ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
একদিকে তৃণমূল, অন্যদিকে সিপিএম; একদিকে আপ, অন্যদিকে কংগ্রেস; কোথাও সমাজবাদী পার্টি, কোথাও ডিএমকে— এই বহুবর্ণ জোটের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত ছিল প্রায় অবশ্যম্ভাবী।
আসন বণ্টন, নেতৃত্বের প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নিয়ে গোপন প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত জোটকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দেয়।
তবু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে ঘিরে বিতর্কের কারণ অন্যত্র। তাঁরা দু’জনই এমন নেতা, যাঁরা নিজেদের রাজ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী, জাতীয় রাজনীতিতে উচ্চাভিলাষী এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী রাজনীতির স্বাভাবিক শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে অনিচ্ছুক।
ফলে বিরোধী ঐক্যের যে কাঠামো কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারত, সেখানে তাঁরা প্রায়শই সমান্তরাল কেন্দ্র তৈরির চেষ্টা করেছেন।
আজ যখন INDIA জোটের শরিকরা একে একে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন সেই পুরনো প্রশ্ন আবার ফিরে আসছে— জোটটি কি বিজেপির শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছে, নাকি নিজের শরিকদের পারস্পরিক অবিশ্বাসেই ভেঙে পড়েছে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের উত্তর স্পষ্ট: বিজেপি যতটা না INDIA জোটকে ভেঙেছে, তার চেয়ে বেশি ভেঙেছে জোটের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আর সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার দুই সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অরবিন্দ কেজরিওয়াল।
সত্য-মিথ্যা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে খুব কম লোকেরই দ্বিমত আছে— বিরোধী ঐক্যের যে স্বপ্ন একসময় দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, আজ তা অনেকটাই ভগ্নাবশেষ। আর সেই ভগ্নাবশেষের ইতিহাস লিখতে গেলে এই দুই নেতার ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।