Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৩৫ সালে নিউজিল্যান্ডের মাত্র ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর স্কুলের সঙ্গে শিক্ষাসফরে গিয়েছিল একটি আগ্নেয়গিরির চূড়ায়। সে জানত না, সেই দিনটিই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।
চূড়ায় পৌঁছে সে এমন এক অনুভূতির সম্মুখীন হয়েছিল, যা আগে কখনও হয়নি। মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া উচ্চতা, চারদিকে বিস্তৃত অসীম প্রকৃতি, মেঘের ওপরে দাঁড়ানোর বিস্ময়—সব মিলিয়ে তার মনে জন্ম নিল এক নতুন আকাঙ্ক্ষা। সে বুঝতে পারল, পাহাড়ে ওঠার আকর্ষণ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যে নয়; এর মধ্যে রয়েছে নিজেকে অতিক্রম করার এক গভীর আনন্দ।
সেই কিশোরের নাম ছিল এডমন্ড হিলারি।
পরবর্তী দুই দশকে তিনি শুধু পাহাড়ে ওঠেননি; তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এমন এক মানুষে, যিনি মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিযাত্রী হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। মৌমাছি পালন ও পর্বতারোহণের কঠোর অনুশীলন গড়ে তুলেছিল তাঁর অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা। ছোট ছোট পাহাড় জয়ের মধ্য দিয়েই তিনি তৈরি করেছিলেন এভারেস্ট অভিযানের ভিত্তি। তাঁর জীবনের গল্প প্রমাণ করে, বড় সাফল্য এক লাফে আসে না; আসে ধাপে ধাপে অগ্রগতির মাধ্যমে।
যে জীবন তৈরি করেছিল এভারেস্ট বিজয়ীকে
হিলারির পরিবার মৌমাছি পালনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। গ্রীষ্মকালে তিনি বাবার সঙ্গে মৌচাকের কাজ করতেন। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁর চরিত্রের ভিত তৈরি করেছিল। অন্যদিকে, শীতকাল এলেই তিনি ছুটে যেতেন পাহাড়ের দিকে।
মৌমাছির খামারে কাজ এবং পর্বতারোহণ—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগত যেন একে অপরকে পরিপূরক করছিল। একদিকে ধৈর্য, অন্যদিকে সাহস। একদিকে নিয়মিত শ্রম, অন্যদিকে সীমা ভাঙার আকাঙ্ক্ষা। এই দুইয়ের মিলনেই তৈরি হচ্ছিল ভবিষ্যতের এভারেস্ট বিজয়ী।
প্রতিটি পাহাড় তাঁর কাছে ছিল একটি নতুন পাঠশালা। প্রতিটি আরোহণ তাঁকে একটু একটু করে আরও দক্ষ, আরও শক্তিশালী এবং আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলছিল।
প্রথম সাফল্যের স্বাদ
১৯৩৯ সালে, মাত্র ২০ বছর বয়সে, হিলারি তাঁর দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে আরোহণ করেন ১,৯৩৩ মিটার উচ্চতার মাউন্ট অলিভিয়ারে। আজকের দৃষ্টিতে হয়তো এটি খুব বড় কোনো পাহাড় বলে মনে হবে না, কিন্তু তখনকার তরুণ হিলারির জন্য এটি ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ—হিমশীতল বাতাস, অনিশ্চয়তা, শারীরিক ক্লান্তি এবং ব্যর্থতার ভয় সবকিছু মিলিয়ে।
চূড়ায় পৌঁছানোর পর তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, মানুষ নিজের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি কিছু করতে সক্ষম। এই সাফল্য তাঁকে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস দিল।
আরও উঁচু, আরও দূরে
১৯৪৮ সালে, ২৯ বছর বয়সে, তিনি আরোহণ করেন নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আওরাকি বা মাউন্ট কুক। ৩,৭৬৪ মিটার উচ্চতার এই পর্বত ছিল তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে নিউজিল্যান্ডের পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে তাঁর কাছে ছোট হয়ে আসছিল। তাঁর দৃষ্টি এবার ঘুরল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পর্বতমালার দিকে—হিমালয়ের দিকে।
হিমালয়ের পথে
১৯৫১ সালে তিনি একটি অভিযাত্রী দলের সদস্য হিসেবে হিমালয়ে যান। লক্ষ্য ছিল বিশ্বের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ পর্বত চো ওয়ু(Cho Oyu), যার উচ্চতা ৮,১৮৮ মিটার। দলটি শেষ পর্যন্ত শিখরে পৌঁছাতে পারেনি, উঠেছিল প্রায় ৬,২০০ মিটার পর্যন্ত।
অনেকের কাছে এটি ব্যর্থতা মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটিই ছিল প্রস্তুতির অধ্যায়। সেখানে তিনি শিখেছিলেন উচ্চতাজনিত অসুস্থতা, চরম আবহাওয়া, অক্সিজেনের স্বল্পতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের বাস্তবতা। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করেছিল।
এভারেস্ট: স্বপ্নের চূড়া
১৯৫৩ সালে এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নোরগে মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সফলভাবে আরোহণ করলেন ৮,৮৪৮ মিটার উচ্চতার মাউন্ট এভারেস্টের শিখরে। বহুদিন ধরে মানুষের কাছে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা সেই কাজটি তাঁরা সম্পন্ন করলেন।
সেই মুহূর্তে হিলারি শুধু একটি পাহাড় জয় করেননি। তিনি জয় করেছিলেন বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ক্লান্তি, ব্যর্থতা, সন্দেহ এবং সীমাবদ্ধতাকে। এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানো ছিল তাঁর যাত্রার সমাপ্তি নয়; বরং সেই দীর্ঘ প্রস্তুতির স্বাভাবিক পরিণতি।
প্রেরণার প্রকৃত রহস্য
হিলারির জীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—প্রেরণা আসলে কোনো রহস্যময় শক্তি নয়, এটি তৈরি হয় সঠিক চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে।
ভাবুন, যদি ১৬ বছর বয়সে তিনি সরাসরি এভারেস্টে ওঠার চেষ্টা করতেন? সম্ভবত কয়েকশো মিটার উঠেই তিনি হাল ছেড়ে দিতেন। আবার যদি তিনি সারাজীবন শুধু ছোট ছোট টিলায় ওঠানামা করতেন, তাহলে হয়তো পর্বতারোহণের প্রতিই আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন।
তাঁর সাফল্যের মূল ছিল ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া। প্রতিটি নতুন পাহাড় আগেরটির চেয়ে একটু বেশি কঠিন ছিল কিন্তু কখনও এত কঠিন ছিল না যে তা অসম্ভব মনে হয়, আবার এত সহজও ছিল না যে তা বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। এই অবস্থাকেই মনোবিজ্ঞানীরা বলেন ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য কঠিনতা’। মানুষের সর্বোচ্চ প্রেরণা জন্ম নেয় ঠিক এই পরিস্থিতিতে যেখানে চ্যালেঞ্জ আছে, কিন্তু সাফল্যের সম্ভাবনাও আছে।
অগ্রগতির পরিমাপ কেন জরুরি
হিলারির যাত্রা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখায়—যে অগ্রগতি দেখা যায় না, তা প্রেরণা জোগায় না। প্রতিটি শিখর তাঁর কাছে ছিল একটি মাইলফলক, প্রতিটি আরোহণ তাঁকে জানিয়ে দিত যে তিনি সঠিক পথে এগোচ্ছেন।
জিমে যারা অনুশীলন করেন, তারা যেমন জানেন গত মাসে কত ওজন তুলেছিলেন আর আজ কত তুলতে পারছেন, তেমনি হিলারিও জানতেন তিনি আগের চেয়ে কতটা উন্নতি করেছেন। এই দৃশ্যমান অগ্রগতিই তাঁকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
জীবনের যে ক্ষেত্রেই হোক—লেখালেখি, ব্যবসা, পড়াশোনা, শিল্পচর্চা কিংবা ব্যক্তিগত উন্নতি—অগ্রগতিকে পরিমাপ করার ব্যবস্থা না থাকলে উৎসাহ দ্রুত হারিয়ে যায়।
এভারেস্টের পরেও
অনেকেই মনে করেন, এভারেস্ট জয়ই ছিল হিলারির জীবনের শেষ কথা। আসলে তা নয়। পরে তিনি অ্যান্টার্কটিকা অভিযান করেছেন, মানবকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত হয়েছেন, হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, জীবনের প্রকৃত আনন্দ কোনো একক সাফল্যে নয়; বরং নতুন চ্যালেঞ্জের সন্ধানে। প্রেরণা টিকিয়ে রাখার রহস্য লুকিয়ে আছে এই ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য কঠিনতা’ এবং অগ্রগতির পরিমাপেই।
এডমন্ড হিলারির বিখ্যাত উক্তি তাই আজও অনুপ্রেরণার উৎস—”আমি যখন এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়েছিলাম, তখন উপত্যকার ওপারে মাকালুর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হয়নি এটাই সবকিছুর শেষ। বরং আমি আরও দূরে তাকাচ্ছিলাম—নতুন এবং আকর্ষণীয় চ্যালেঞ্জগুলোর দিকে।”
“While standing on top of Everest, I looked across the valley towards Makalu and mapped out in my mind a route by which it might be climbed. It showed that even though I was standing on top of the world, it wasn’t the end of everything. I was already looking for new and interesting challenges.”
সাফল্য কোনো গন্তব্য নয়, এটি এক শিখর থেকে আরেক শিখরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অবিরাম যাত্রা। আর সেই যাত্রা শুরু হয় একটি ছোট পদক্ষেপ থেকে—যেমনটি শুরু হয়েছিল ১৯৩৫ সালের এক স্কুলভ্রমণে, এক কিশোরের বিস্মিত দৃষ্টিতে, এক আগ্নেয়গিরির চূড়ায় দাঁড়িয়ে।