Table of Contents
হাইলাইটস:
- ছাত্র আত্মহত্যাকে শুধু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট-নিযুক্ত টাস্কফোর্স।
- ২০২২ সালে ভারতে ১৩ হাজার ছাত্র আত্মহত্যা করেছে, যা একই বছরে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যাকেও ছাড়িয়েছে।
- উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যা রোধে কোনও বাধ্যতামূলক আইন নেই।
- দলিত, আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের ছাত্রদের মধ্যে ড্রপআউট হার উদ্বেগজনক।
- অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নেই, নেই আত্মহত্যা প্রতিরোধের প্রোটোকলও।
- বৈষম্য, আর্থিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতাকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে রিপোর্ট।
বাংলাস্ফিয়ার: সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স (এনটিএফ)-এর অন্তর্বর্তী রিপোর্ট ভারতের শিক্ষা জগতের সামনে এক অস্বস্তিকর আয়না তুলে ধরেছে। রিপোর্টের মূল বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট—ভারতে ছাত্র আত্মহত্যাকে এতদিন মূলত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক বেশি গভীর এবং কাঠামোগত সংকট।
২০২৬ সালের অমিত কুমার বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় সুপ্রিম কোর্ট উল্লেখ করেছিল যে গত এক দশকে দেশে ছাত্র আত্মহত্যার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২২ সালে এই সংখ্যা পৌঁছেছে ১৩ হাজারে। অর্থাৎ, দেশের মোট আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর ৭.৬ শতাংশই ছাত্রছাত্রী। একই বছরে কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে এই পরিসংখ্যান।
এই উদ্বেগ থেকেই প্রাক্তন বিচারপতি এস রবীন্দ্র ভাট-এর নেতৃত্বে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
আত্মহত্যা নয়, আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে বুঝতে হবে
টাস্কফোর্সের মতে, আত্মহত্যা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ। আত্মহত্যার চিন্তা, আত্মক্ষতি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া—সবই একই ধারাবাহিকতার অংশ।
রিপোর্ট বলছে, ভারতে প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনার বিপরীতে ২০০-রও বেশি মানুষ কোনও না কোনওভাবে আত্মহননের চিন্তা বা প্রবণতার মধ্যে থাকেন। আত্মহত্যার প্রচেষ্টার সংখ্যা আরও বেশি।
সুতরাং লক্ষ্য শুধু কাউকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনা নয়; বরং তাকে এমন অবস্থায় পৌঁছতে বাধ্য করল কী, সেটি বোঝা।
সবচেয়ে বড় শূন্যতা: কোনও আইন-ই নেই
রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সম্ভবত আইনি ক্ষেত্রেই।
বহু বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-এর নির্দেশিকা, বিভিন্ন কমিটির রিপোর্ট এবং সরকারি নীতি থাকলেও ছাত্র আত্মহত্যা প্রতিরোধে ভারতে কোনও সরাসরি আইন নেই।
এনটিএফ বলছে, বর্তমান ব্যবস্থাগুলি মূলত পরামর্শমূলক এবং প্রতিক্রিয়াশীল। বাধ্যতামূলক নয়।
আমেরিকা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং কানাডা-এর মতো দেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধে নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির জবাবদিহি, তথ্য সংগ্রহ এবং পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক।
ভারতে এখনও সবকিছু নির্দেশিকার স্তরেই আটকে আছে।
রিপোর্ট স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, আইনের বাধ্যবাধকতা না থাকলে বাস্তবায়নও দুর্বল হয়।
উচ্চশিক্ষার বিস্তার, কিন্তু অবকাঠামোর ঘাটতি
২০০১-০২ সালে ভারতে উচ্চশিক্ষায় ছাত্রসংখ্যা ছিল ৮৮ লক্ষ। ২০২১-২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৩২ লক্ষ।
কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি সরকারি বিনিয়োগ।
২০২১-২২ সালে উচ্চশিক্ষায় সরকারি ব্যয় ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ১.২৯ শতাংশ। বহু জাতীয় কমিশন বহুদিন ধরে ২ শতাংশ ব্যয়ের সুপারিশ করে আসছে।
ফলে প্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু সহায়ক ব্যবস্থা বাড়েনি।
প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সংগ্রাম
টাস্কফোর্সের সমীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ৪৬ শতাংশই প্রথম প্রজন্মের উচ্চশিক্ষার্থী। অর্থাৎ তাদের পরিবারে আগে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি। এদের অনেকেই গ্রাম বা ছোট শহর থেকে আসেন। নতুন পরিবেশ, ভাষাগত সমস্যা, আর্থিক চাপ এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তাদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
সংরক্ষণে প্রবেশ, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভিতরে বৈষম্য
দেশের উচ্চশিক্ষায় বর্তমানে তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা মিলিয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ। কিন্তু শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ছবিটা একেবারেই আলাদা।
আইআইটি ও এনআইটিগুলিতে ৬৭.৭১ শতাংশ শিক্ষক উচ্চবর্ণ বা সুবিধাভোগী সামাজিক গোষ্ঠী থেকে এসেছেন।
তফসিলি জাতিভুক্ত শিক্ষক মাত্র ৭.৫৭ শতাংশ এবং তফসিলি জনজাতির শিক্ষক ১.৯১ শতাংশ।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পরিস্থিতি আরও অসম।
রিপোর্টের ভাষায়, এই সামাজিক অমিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, হতাশা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
১৩,৬০০-এর বেশি ছাত্র পড়াশোনা ছেড়েছেন
২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি এবং আইআইএম মিলিয়ে ১৩ হাজার ৬০০-রও বেশি তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি এবং ওবিসি ছাত্র পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, এদের অনেকেই অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছেন বা ব্যক্তিগত কারণে পড়াশোনা ছেড়েছেন।
কিন্তু গবেষণা অন্য ছবি দেখাচ্ছে।
গবেষক প্রভাকর কৃষ্ণমূর্তি-র ২০২৫ সালের একটি সমীক্ষা বলছে, আইআইটি দিল্লি এবং আইআইটি খড়গপুর-এ এসসি ও এসটি ছাত্রদের ড্রপআউট হার সাধারণ ছাত্রদের তুলনায় ৩১৮ শতাংশ বেশি।
এই ড্রপআউটের প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই আর্থিক সমস্যা প্রধান কারণ।
বৃত্তির টাকা না পেয়ে পরীক্ষায় বসতে না দেওয়ার অভিযোগ
অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, সরকার থেকে বৃত্তির টাকা দেরিতে আসার কারণে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেছে।
কেউ পরীক্ষায় বসতে পারেননি, কেউ হোস্টেল থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন, কারও ডিগ্রি আটকে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যার জন্য ছাত্ররা দায়ী না হলেও শাস্তি তাদেরই ভোগ করতে হয়েছে।
কাউন্সেলিং ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২৭ হাজার ১৩৬ জন “কাউন্সেলর” রয়েছেন।
শুনতে আশাব্যঞ্জক লাগলেও বাস্তব চিত্র অন্যরকম।
টাস্কফোর্স ৫০ জনের যোগ্যতা পরীক্ষা করে দেখেছে, তাদের মধ্যে ৪৭ জনই প্রকৃতপক্ষে শিক্ষক, প্লেসমেন্ট কো-অর্ডিনেটর বা একাডেমিক উপদেষ্টা। তাঁরা প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নন।
৭০ শতাংশেরও বেশি প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা নেই।
৪ শতাংশেরও কম প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যার ঝুঁকি মোকাবিলার কোনও লিখিত প্রোটোকল রয়েছে।
২৩টি আইআইটির মধ্যে মাত্র চারটিতে মানসিক স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি সামলানোর নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে।
ছাত্রদের ভরসা নেই কাউন্সেলিং ব্যবস্থার উপর
অনেক শিক্ষার্থী টাস্কফোর্সকে জানিয়েছেন, তারা কাউন্সেলিং নিতে চান না কারণ অতীতে তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য শিক্ষক, প্রশাসন বা অভিভাবকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষত LGBTQ+ শিক্ষার্থী কিংবা যাদের পরিবারের সঙ্গেই দ্বন্দ্ব রয়েছে, তারা সাহায্য চাইতেই ভয় পান। কারণ সাহায্য চাইলেই সেই তথ্য পরিবারকে জানানো হতে পারে।
চিকিৎসা শিক্ষায় অমানবিক চাপ
চিকিৎসা ও নার্সিং শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা আরও উদ্বেগজনক।
কেউ কেউ জানিয়েছেন, একটানা ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। পর্যাপ্ত ঘুম বা খাবারের সুযোগ থাকে না।
বিশ্রাম চাইলে তাদের “দুর্বল” বা “অলস” বলে অপমান করা হয়।
একজন শিক্ষার্থী চিকিৎসা শিক্ষাকে সরাসরি “বন্ধুয়া শ্রম”-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
জাতপাত, ভাষা ও সামাজিক পরিচয়ের অদৃশ্য দেয়াল
রিপোর্টে উঠে এসেছে আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
অনেক প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের জেইই বা নিট র্যাঙ্ক জিজ্ঞেস করা হয়। এর মাধ্যমে প্রায়শই তাদের সংরক্ষিত শ্রেণি থেকে এসেছে কি না, তা অনুমান করার চেষ্টা চলে।
ইংরেজি বলার দক্ষতা, শহুরে আচরণ বা পোশাক-পরিচ্ছদকে সামাজিক মর্যাদার সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ছোট শহর বা গ্রাম থেকে আসা শিক্ষার্থীদের “ছাপরি” বলে অপমান করার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
কী সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স?
চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনও আসেনি। তবে অন্তর্বর্তী রিপোর্টে কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে—
- তিন মাসের মধ্যে সমস্ত শিক্ষক পদ পূরণ করতে হবে।
- সংরক্ষিত পদ শূন্য রাখা যাবে না।
- উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের পদ এক মাসের বেশি খালি রাখা যাবে না।
- ছাত্র আত্মহত্যার প্রতিটি ঘটনা বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানাতে হবে।
- প্রতিটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানে ২৪ ঘণ্টার চিকিৎসা সহায়তা থাকতে হবে।
- জাতীয় অপরাধ নথি ব্যুরোকে স্কুল ও উচ্চশিক্ষার ছাত্র আত্মহত্যার তথ্য আলাদা করে প্রকাশ করতে হবে।
উপসংহার
এনটিএফের রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হল—ছাত্র আত্মহত্যাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, মানসিক দুর্বলতা বা মনোরোগের সমস্যা হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণ অদৃশ্য থেকে যাবে।
বৈষম্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অমানবিক একাডেমিক চাপ, দুর্বল প্রতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং জবাবদিহিহীন প্রশাসন—সব মিলিয়েই তৈরি হচ্ছে এমন এক পরিবেশ, যেখানে অনেক ছাত্র ধীরে ধীরে প্রান্তে ঠেলে যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই টাস্কফোর্স তাই আত্মহত্যার ঘটনাকে নয়, আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যাওয়া ব্যবস্থাকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।`