হাইলাইটস
- আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের রুশ অংশে বায়ু লিকের সমস্যা আরও গুরুতর হওয়ায় সতর্কতা জারি।
- স্টেশনে থাকা সাত নভোচারীর মধ্যে পাঁচজনকে সাময়িকভাবে স্পেসএক্সের ডক করা মহাকাশযানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
- রাশিয়ার মেরামতি পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানায় নাসা।
- ফাটলে পৌঁছতে করাত ব্যবহার করার সিদ্ধান্তকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন মার্কিন বিশেষজ্ঞরা।
- রাশিয়ার দাবি, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও নভোচারীদের প্রাণহানির কোনও তাৎক্ষণিক আশঙ্কা ছিল না।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা International Space Station-এ ফের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্টেশনের রুশ অংশে অবস্থিত Zvezda Module-এ দীর্ঘদিন ধরে চলা বায়ু লিকের সমস্যা সম্প্রতি আরও বেড়ে যাওয়ায় এক পর্যায়ে জরুরি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয় সংশ্লিষ্ট মহাকাশ সংস্থাগুলি।
খবরে জানা গেছে, স্টেশনে অবস্থানরত সাতজন নভোচারীর মধ্যে পাঁচজনকে নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িকভাবে একটি ডক করা SpaceX মহাকাশযানে স্থানান্তর করা হয়। মহাকাশ স্টেশনে কোনও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে যাতে দ্রুত পৃথিবীতে ফিরে আসা যায়, সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ওপরে কক্ষপথে ঘুরছে। সেখানে জীবনধারণ সম্পূর্ণভাবে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সামান্য বায়ু লিকও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। কারণ বদ্ধ মহাকাশ পরিবেশে ধীরে ধীরে বাতাস বেরিয়ে যেতে থাকলে অক্সিজেনের মাত্রা এবং অভ্যন্তরীণ চাপ কমে গিয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
জভেজদা মডিউলে বায়ু লিকের সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। কয়েক বছর ধরেই ওই অংশে ক্ষুদ্র ফাটল এবং সিলিং-সংক্রান্ত ত্রুটির খবর পাওয়া যাচ্ছিল। বিভিন্ন সময়ে অস্থায়ী মেরামতির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিমাপ থেকে বোঝা যায়, লিকের হার আগের তুলনায় বেড়ে গেছে এবং সমস্যার উৎস খুঁজে বের করা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
এই অবস্থায় রুশ মহাকাশচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের কাজ শুরু করেন। কিন্তু সেই মেরামতি পদ্ধতি নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়। রাশিয়ার প্রকৌশলীরা ফাটলের উৎসে পৌঁছতে একটি করাত ব্যবহার করে কাঠামোর একটি অংশ কাটার পরিকল্পনা করেন। নাসার বিশেষজ্ঞরা এই পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানান। তাদের আশঙ্কা ছিল, ভুল জায়গায় কাটাকাটি করলে কাঠামোগত ক্ষতি বাড়তে পারে অথবা লিক আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন ও রুশ দলের মধ্যে প্রযুক্তিগত মতভেদ দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। জানা গেছে, মেরামতির কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করার পর ঝুঁকির মাত্রা পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। এরপরই স্পেসএক্স মহাকাশযানে আশ্রয় নেওয়া নভোচারীদের আবার স্টেশনের মূল অংশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
রুশ মহাকাশ সংস্থা জোর দিয়ে বলেছে যে স্টেশনে থাকা কোনও নভোচারী তাৎক্ষণিক বিপদের মধ্যে ছিলেন না। তাদের বক্তব্য, এটি ছিল একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা মাত্র। তবুও ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ক্রমবর্ধমান বয়স এবং রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
১৯৯৮ সালে নির্মাণ শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন এখন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা প্রকল্পগুলির একটি। তবে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মহাকাশের কঠোর পরিবেশে থাকার ফলে এর বিভিন্ন অংশে ক্ষয়, ধাতব ক্লান্তি এবং প্রযুক্তিগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনা শুধু একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; এটি ভবিষ্যতের মহাকাশ কর্মসূচির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। আগামী বছরগুলিতে স্টেশনটির আয়ু বাড়ানো, নতুন মহাকাশ স্টেশন নির্মাণ এবং নিরাপত্তা মান উন্নত করার প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, জভেজদা মডিউলের বায়ু লিক আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ঘটনাটি দেখিয়ে দিল যে পৃথিবী থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে মহাকাশে জীবনধারণ কতটা জটিল এবং সেখানে সামান্য প্রযুক্তিগত সমস্যাও কীভাবে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।