হাইলাইটস
- ভারত-নেপাল সীমান্তের কাছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফের হাতে গ্রেফতার জাহাঙ্গির খান।
- একাধিক তোলাবাজি, ভয় দেখানো ও হিংসার মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন তিনি।
- ফলতা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্কের পর থেকেই কার্যত আত্মগোপনে ছিলেন।
- বিরোধীদের অভিযোগ, এটি কেবল একজন নেতার গ্রেফতারি নয়, তৃণমূলের পুরনো ক্ষমতা কাঠামোর পতনের প্রতীক।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত নাম জাহাঙ্গির খান। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মুখ হিসেবে পরিচিত এই তৃণমূল নেতা অবশেষে গ্রেফতার হলেন ভারত-নেপাল সীমান্তের কাছে। সোমবার ভোরে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) তাঁকে আটক করে। পুলিশ সূত্রে খবর, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন এবং সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ।
জাহাঙ্গির খানের গ্রেফতারি শুধু একটি আইনগত ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল, ফলতা কেন্দ্রের বিতর্কিত নির্বাচন এবং ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট।
ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ ও পুনর্নির্বাচনকে ঘিরে গত মাসে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছিল ভোটে অনিয়ম, ভয় দেখানো এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেয়। জাহাঙ্গির খান ছিলেন তৃণমূলের প্রার্থী এবং তাঁর নাম ঘিরেই বিতর্কের বড় অংশ আবর্তিত হয়।
নির্বাচনের আগেই তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক ফৌজদারি অভিযোগ জমা পড়তে শুরু করে। পুলিশ জানিয়েছে, ফলতা থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি পৃথক এফআইআর দায়ের হয়েছিল। অভিযোগগুলির মধ্যে ছিল তোলাবাজি, স্থানীয় বাসিন্দাদের হুমকি দেওয়া, হামলা চালানো এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ভয় দেখানো।
এই অভিযোগগুলিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দাবি করেছিলেন জাহাঙ্গির খান। তিনি কলকাতা হাইকোর্টে গিয়ে গ্রেফতারি থেকে সুরক্ষা চেয়েছিলেন। আদালত তাঁকে সাময়িক রেহাইও দিয়েছিল। কিন্তু মে মাসের শেষ সপ্তাহে সেই অন্তর্বর্তী সুরক্ষা প্রত্যাহার হয়ে যায়। আদালত আর গ্রেফতারির বিরুদ্ধে তাঁকে রক্ষা করেনি।
সেই সময় থেকেই কার্যত উধাও হয়ে যান জাহাঙ্গির খান। ফলতার বাড়ি বন্ধ পাওয়া যায়। রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা শুরু হয়—তিনি কি রাজ্যের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছেন, না কি রাজ্য ছেড়ে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন? তদন্তকারীরা তাঁর মোবাইল ফোনের গতিবিধি এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের যোগাযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালাতে থাকে।
সোমবার সেই অনুসন্ধানেরই পরিণতি। উত্তরবঙ্গের ভারত-নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় একটি গোপন অভিযানে তাঁকে আটক করা হয়। পুলিশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি তিনি ঠিক কোথা থেকে ধরা পড়েছেন। তবে তদন্তকারী সূত্রের দাবি, দীর্ঘ নজরদারির পর তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছিল।
জাহাঙ্গির খানের উত্থানও কম নাটকীয় ছিল না। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে এক প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় স্তরে তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং নির্বাচনী প্রভাব নিয়ে তৃণমূলের মধ্যেই নানা গল্প প্রচলিত ছিল। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন শক্তিশালী নেতা; সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক পেশিশক্তির প্রতীক।
তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। নির্বাচন চলাকালীন এবং তার আগেও তাঁর একাধিক ঘনিষ্ঠ সহযোগী গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, হামলা এবং ভোট-সন্ত্রাসের অভিযোগ ওঠে। মে মাসের শেষ সপ্তাহে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইসরাফিল চাকদারও পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।
এই গ্রেফতারির রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসন যে পুরনো ক্ষমতার কেন্দ্রগুলিকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছে, বিরোধীরা এই ঘটনাকে তারই প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। বিজেপি শিবিরের দাবি, আইন শেষ পর্যন্ত নিজের পথে চলেছে। অন্যদিকে তৃণমূলের একাংশ এখনও মনে করে, জাহাঙ্গির খান রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার।
তবে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা যাই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট। যে নেতা কয়েক সপ্তাহ আগেও নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে ছিলেন, তিনি আজ পুলিশের হেফাজতে। সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন কি না, আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হবে, শেষ পর্যন্ত বিচারব্যবস্থাই তার উত্তর দেবে।
কিন্তু জাহাঙ্গির খানের গ্রেফতারি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনীতিতে একটি প্রতীকী মুহূর্ত হয়ে থাকল। কারণ এটি শুধু একজন নেতার পতনের গল্প নয়; এটি সেই ক্ষমতা-ব্যবস্থারও গল্প, যা একসময় অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হতো, কিন্তু এখন আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের লড়াই লড়ছে।