হাইলাইটস:
- আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শুক্রবারের প্রযুক্তিগত বৈঠক হঠাৎ বাতিল।
- সুইজারল্যান্ডের ওববুর্গেনে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
- ১৪ দফা যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল।
- মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সফরও স্থগিত।
- ইরান বলেছে, আমেরিকাকে আগে সমঝোতার বাস্তব প্রয়োগ দেখাতে হবে।
- লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে নতুন উত্তেজনা।
- ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ তুলে নিয়েছে।
- স্থায়ী শান্তিচুক্তি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও গভীর অবিশ্বাস।
বাংলাস্ফিয়ার: দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা প্রথম ধাক্কা খেল শুক্রবার। সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বাতিল করা হয়েছে।
সুইস গ্রামের ওববুর্গেনে এই বৈঠক শুরু হওয়ার কথা ছিল। মাত্র দুই দিন আগে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)-এর ভিত্তিতে এই আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। ওই সমঝোতায় ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে স্থায়ী সমাধান খোঁজার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন স্বাভাবিক করার রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, তারা এখনও আলোচনার বিষয়ে আশাবাদী। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যিনি ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আপাতত সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন না।
হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেন, “এই আলোচনার লজিস্টিকস কখনও সহজ বা পূর্বানুমানযোগ্য ছিল না। এই মুহূর্তে ভাইস প্রেসিডেন্টের সফর হচ্ছে না।”
বৈঠক বাতিলের সিদ্ধান্ত এতটাই আকস্মিক ছিল যে ওয়াশিংটনের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে ভ্যান্সের সফর কভার করতে সাংবাদিকরাও জড়ো হয়ে গিয়েছিলেন। মার্কিন প্রশাসনের বহু কর্মকর্তা ও অগ্রবর্তী দল ইতিমধ্যেই সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ মোজতবা খামেনেই বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, কিছু সংশয় থাকা সত্ত্বেও তিনি সমঝোতা স্মারকে অনুমোদন দিয়েছেন। একই দিনে আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধও প্রত্যাহার করে নেয়।
তবে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, তেহরান মনে করছে আমেরিকাকে প্রথমে চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের প্রমাণ দিতে হবে। সেই কারণেই পরবর্তী দফার আলোচনায় অংশগ্রহণ নিয়ে এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বৈঠক বাতিলের পেছনে আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে লেবাননের পরিস্থিতি। হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ আরবি সংবাদমাধ্যম আল-মায়াদিন জানিয়েছে, লেবাননে ইজরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের কারণে ইরান তাদের প্রতিনিধিদল পাঠানো বিলম্বিত করেছে।
ইজরায়েল এই শান্তি আলোচনার অংশ ছিল না এবং শুরু থেকেই আমেরিকা-ইরান সমঝোতা নিয়ে দূরত্ব বজায় রেখেছে। শুক্রবার ভোরেও ইজরায়েল নতুন বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের অভিযোগ, হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননে তারা তিনটি ইজরায়েলি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করেছে এবং সংঘর্ষ এখনও চলছে। যদিও ইজরায়েল এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সমঝোতা স্মারকে লেবাননের যুদ্ধের “স্থায়ী সমাপ্তি” এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বারবার বলেছেন, তিনি সব ফ্রন্টে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি প্রত্যাশা করেন।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনও পরিকল্পনা তাদের নেই। এই অবস্থান নিয়ে ট্রাম্প ও ভ্যান্স প্রকাশ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বৃহস্পতিবার ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা যখনই বড় কোনও অগ্রগতির কাছাকাছি পৌঁছাই, তখনই বৈরুতে কোনও জনবহুল এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটে এবং বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। এটা গ্রহণযোগ্য নয়।”
এদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ শুক্রবার সতর্ক করে দিয়েছেন যে চুক্তি লঙ্ঘন করা হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “অন্য পক্ষ যদি চুক্তি ভঙ্গ করে বা সীমা অতিক্রম করে, তাহলে শত্রুর বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিক্রিয়া জানাতে আমরা দ্বিধা করব না।”
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, আদৌ কি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি সম্ভব হবে? কয়েক মাসের এই সংঘাতে অন্তত ৭,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে।
খামেনেইও বৃহস্পতিবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, সামনে পথ মোটেও সহজ নয়। তাঁর মতে, ট্রাম্প “হতাশা থেকে” এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।
তিনি বলেন, “আমেরিকা যদি অতিরিক্ত দাবি করতে চায়, তাহলে আমরা তা মেনে নেব না।”
বর্তমান সমঝোতা অনুযায়ী, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। উভয় পক্ষ রাজি হলে সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি ইরান পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথাও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে আমেরিকা ইতিমধ্যেই ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ তুলে নিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, জাহাজ চলাচলে আর বাধা দেওয়া হবে না, যদিও মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো অঞ্চলেই অবস্থান করবে।
তবু হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি ফেরেনি। যুদ্ধ চলাকালে ইরানের অবরোধের কারণে যে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হিসেবে পরিচিত এই প্রণালীতে কার্যক্রম এখনও সীমিত।
ফলে যুদ্ধবিরতির কাগুজে কাঠামো তৈরি হলেও বাস্তব শান্তি এখনও অনেক দূরের পথ বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। আমেরিকা, ইরান এবং ইজরায়েলের পারস্পরিক অবিশ্বাস, লেবাননের অস্থিতিশীলতা এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে গভীর মতপার্থক্য—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া আবারও এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে।