হাইলাইটস

  • বাজার মূলধনের নিরিখে ভারতকে টপকে গেল তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া।
  • এআই-নির্ভর প্রযুক্তি সংস্থার জোরে পূর্ব এশিয়ার বাজারে বিপুল উত্থান।
  • ২০২৬ সালে এখনও পর্যন্ত ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রায় ২৬.৪ বিলিয়ন ডলার প্রত্যাহার।
  • MSCI Global Standard Index-এ ভারতের অংশীদারিত্ব ২১% থেকে নেমে ১২.৩%-এ।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ ও কুলিং ব্যবস্থায় ভারতের বড় সুযোগ রয়েছে।
  • দুর্বল কর্পোরেট আয় এবং ইরান যুদ্ধজনিত জ্বালানি ধাক্কা বাজারে চাপ বাড়িয়েছে।
  • বিদেশি কোম্পানিগুলি আইপিওর মাধ্যমে নতুন অর্থ তোলার বদলে ভারত থেকে লাভ তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাস্ফিয়ার: একসময় উদীয়মান এশিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় শেয়ারবাজার হিসেবে পরিচিত ছিল ভারত। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই অবস্থান বদলে গেছে। বাজার মূলধনের নিরিখে ভারতকে পেছনে ফেলে দিয়েছে তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া। ফলে বিশ্বের বৃহত্তম শেয়ারবাজারগুলির তালিকায় ভারত এখন সপ্তম স্থানে নেমে এসেছে।

এই পরিবর্তনের পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক বিনিয়োগের বিশ্বব্যাপী উন্মাদনা। তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে রয়েছে এমন বহু সংস্থা, যারা এআই শিল্পের মূল সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। তাইওয়ানের TSMC, দক্ষিণ কোরিয়ার Samsung Electronics এবং SK Hynix-এর মতো সংস্থাগুলি এআই চিপ ও মেমরি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বনেতা। ফলে আন্তর্জাতিক লগ্নিকারীরা বিপুল পরিমাণ অর্থ সেই বাজারগুলিতে ঢালছেন।

অন্যদিকে ভারত এআই-ভিত্তিক এই বিনিয়োগ ঢেউয়ের বড় সুবিধাভোগী হতে পারেনি। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ২৬.৪ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছেন। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালের রেকর্ড ১৮.৯ বিলিয়ন ডলারের বহিঃপ্রবাহও ছাপিয়ে যাবে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সূচকগুলিতে ভারতের অবস্থানের উপর। MSCI Global Standard Index-এ ভারতের অংশীদারিত্ব ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যেখানে ২১ শতাংশে পৌঁছেছিল, বর্তমানে তা কমে ১২.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভারতের কাছে TSMC বা SK Hynix-এর সমতুল্য কোনও বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্ট না থাকায় এআই-নির্ভর আন্তর্জাতিক মূলধন দ্রুত ফিরে আসবে, এমন আশা করা কঠিন।

তবে সকলেই এতটা হতাশ নন।

লাইটহাউস ক্যান্টনের ভারতীয় প্রধান বিনিয়োগ আধিকারিক অভয় লাইজাওয়াল মনে করেন, এআই যুগে ভারতের সুযোগ অন্য জায়গায়। তাঁর মতে, এআই চালাতে যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ, ডেটা সেন্টার, কুলিং সিস্টেম এবং ভৌত অবকাঠামোর প্রয়োজন, ভারত সেই ক্ষেত্রগুলিতে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। অর্থাৎ এআই বিপ্লবের ‘পিকস অ্যান্ড শোভেলস’ বা ভিত্তিগত সরঞ্জাম সরবরাহকারী হিসেবে ভারতের সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারতের শেয়ারবাজার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। তাইওয়ান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো একটি মাত্র প্রযুক্তি খাতের উপর ভারতের বাজার নির্ভরশীল নয়। ব্যাংকিং, ভোক্তা পণ্য, ওষুধ, শিল্প উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিকম এবং পরিষেবা—বিভিন্ন খাতের সমন্বয়ে ভারতের বাজার গঠিত।

দুর্বল মুনাফা ও ইরান যুদ্ধের ধাক্কা

বিদেশি অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার পিছনে শুধু এআই-ফ্যাক্টরই কাজ করছে না। কর্পোরেট আয়ের দুর্বল বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে।

ইরান-সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তেলের দাম বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পায়, মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ে এবং টাকার উপর চাপ তৈরি হয়।

কোড অ্যাডভাইজার্সের অংশীদার ও ফান্ড ম্যানেজার ঋষভ নাহারের মতে, বর্তমান উচ্চ মূল্যায়ন ধরে রাখতে হলে ভারতীয় কোম্পানিগুলির আয় দ্রুত বাড়তে হবে। কিন্তু সেই গতি এখনও দেখা যাচ্ছে না। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের নীতি নিচ্ছেন।

এদিকে তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভারতীয় রুপি ঐতিহাসিক নিম্নস্তরে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, টাকার স্থিতিশীলতা ফিরলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কিছুটা ফিরে আসতে পারে।

টাকাকে শক্তিশালী করতে আরবিআইয়ের পদক্ষেপ

এই পরিস্থিতিতে সঞ্জয় মালহোত্রা-র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বিদেশি মূলধন আকর্ষণের জন্য একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।

সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা সরকারি বন্ডের মূলধনী লাভের উপর কর তুলে দিয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী ভারতীয়দের ডলার আমানত প্রকল্পেও অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আরবিআই আশা করছে, এই পদক্ষেপগুলির ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসবে।

গভর্নর মালহোত্রা স্পষ্ট জানিয়েছেন, মূলধন বহির্গমনের উপর কোনও নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপের চিন্তা বর্তমানে সরকারের নেই।

আইপিও বুম চলছে, কিন্তু অর্থ যাচ্ছে বিদেশে

সব প্রতিকূলতার মধ্যেও ভারতের বহু বছরের আইপিও বুম এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে এর একটি অস্বস্তিকর দিকও সামনে এসেছে।

অনেক বিদেশি মালিকানাধীন সংস্থা ভারতে তালিকাভুক্ত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নতুন প্রকল্পে অর্থ সংগ্রহের জন্য নয়। তারা ‘অফার ফর সেল’ (OFS)-এর মাধ্যমে নিজেদের পুরনো শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করছে এবং সেই অর্থ বিদেশে মূল কোম্পানির কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

২০২৬ সালে এ ধরনের সেকেন্ডারি অফারের মাধ্যমে বিদেশি সংস্থাগুলির মূল কোম্পানিগুলি প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী মাসগুলিতেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

উপসংহার

ভারতের শেয়ারবাজার বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে এআই-নির্ভর প্রযুক্তি বিপ্লবের মূল স্রোত থেকে কিছুটা বাইরে থাকার কারণে বিদেশি মূলধন পূর্ব এশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে ভারতের অর্থনীতি এখনও বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলির অন্যতম।

প্রশ্ন হল, ভারত কি এআই চিপ নির্মাতা তৈরি করতে পারবে, নাকি এআই অবকাঠামোর ভিত্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজের নতুন ভূমিকা নির্ধারণ করবে? আগামী কয়েক বছর সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে ভারতীয় শেয়ারবাজার আবার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের প্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে কি না।