শ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের বিচারিক যাচাইপর্বে বাদ পড়া ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ২২.২১ লক্ষই নাম ফেরানোর আবেদন করেছেন। অর্থাৎ, বাদ পড়া ভোটারদের প্রায় ৮২ শতাংশ সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনের আবেদনের জবাবে সুপ্রিম কোর্টে এই তথ্য জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

কমিশনের সর্বশেষ হিসাবে মোট আপিল ৩৮.৩১ লক্ষ। এর মধ্যে ২২.২১ লক্ষ নাম ফেরানোর আবেদন; বাকি ১৬.১০ লক্ষ তালিকায় থাকা ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি। দ্বিতীয় ধরনের আবেদন কারা করেছেন, কমিশন তা জানায়নি। ফলে সব আপিলকে নাম হারানো মানুষের আবেদন বলে গণ্য করা যাবে না।

আপিলের নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করতে রাজ্যের লোকসভা কেন্দ্রের সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আপিল ট্রাইব্যুনাল বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন। তাদের বক্তব্য, ব্যবহৃত সফটওয়্যারের সাহায্যে বর্তমান কেন্দ্রের বাইরেও শুনানি করা সম্ভব।

ডেরেকের আবেদনে ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রের ফল বাতিলের দাবি রয়েছে। তাঁর যুক্তি, সেখানে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। কমিশনের পাল্টা বক্তব্য, নির্বাচনের ফলকে চ্যালেঞ্জ করতে নির্ধারিত নির্বাচনী মামলা করতে হবে। বিচারিক যাচাইয়ে নাম বাদ পড়ার সংখ্যা জয়ের ব্যবধান ছাড়িয়েছে, এমন ২১টি আসনে তৃণমূলও জিতেছে বলে জানিয়েছে কমিশন।

বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগও খারিজ করেছে কমিশন। তাদের দাবি, আবেদনকারী বিচারিক যাচাইয়ে বাদ পড়া নামের সঙ্গে মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত কিংবা একাধিকবার নথিভুক্ত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার হিসাব মিশিয়েছেন। কমিশনের বক্তব্য, যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই সংশোধন হয়েছে।

নতুন হিসাবের গুরুত্ব বুঝতে আগের হলফনামাটি দেখা প্রয়োজন। কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ বসুর মামলায় বৃহস্পতিবার কমিশন জানিয়েছিল, মোট ৩৮,২০,৬৮৩টি আপিলের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১,০২,২৩১টির। বকেয়া ছিল ৩৭,১৮,৪৫২টি। কিন্তু কতগুলি নাম ফেরানোর এবং কতগুলি নাম বাদ দেওয়ার আবেদন, সেই বিভাজন তখন দেওয়া হয়নি। শুক্রবারের জবাবে প্রথমবার সেই পৃথক হিসাব পাওয়া গেল।

এখানে দুটি তথ্য আলাদা রাখা জরুরি। আগের হলফনামার মোট আপিল ৩৮.২০ লক্ষ; পরের জবাবে তা ৩৮.৩১ লক্ষ। তাই আগের বকেয়া সংখ্যাকে নতুন মোট আবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে বর্তমান নিষ্পত্তির হিসাব বলা সঠিক হবে না। তবে বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী নিষ্পত্তির হার ছিল মাত্র প্রায় ২.৭ শতাংশ।

গত ২৫ অগস্টের শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী আবেদনগুলির প্রকৃতি অনুযায়ী পৃথক তথ্য চেয়েছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণের মূল কথা ছিল, কারও নাম তালিকায় থাকা এবং কারও নাম বাদ যাওয়ার প্রভাব এক নয়। নাম বাদ গেলে ব্যক্তির ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। সেই কারণে এমন আবেদন আগে শোনার প্রয়োজন আছে কি না, আদালত তা বিবেচনা করতে চেয়েছিল।

এই বিচারিক যাচাইয়ের পটভূমিও ব্যতিক্রমী। নির্বাচন কমিশন ও তৎকালীন রাজ্য সরকারের মধ্যে আস্থার ঘাটতির প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের দিয়ে ভোটারদের যোগ্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করে। প্রায় ৭০০ আধিকারিক প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নথি পরীক্ষা করেন। পরে তাঁদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শোনার জন্য অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতিদের নিয়ে ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। সেগুলি কাজ শুরু করে ১৩ এপ্রিল।

আপিলের সংখ্যা থেকে অবশ্য সব আবেদনকারীর নাম ভুলভাবে বাদ গিয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। প্রত্যেকের দাবি নথি ও শুনানির ভিত্তিতে বিচার্য। একইভাবে, তালিকাভুক্ত কারও বিরুদ্ধে আপত্তি জমা পড়লেই তিনি অযোগ্য হয়ে যান না। এই পার্থক্যটি বজায় রেখেই কমিশনের নতুন পরিসংখ্যান বিচার করতে হবে।

তবু বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম ফেরানোর দাবি এবং নিষ্পত্তির ধীরগতি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে রাখছে: প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকলেই কি তা কার্যকর হয়, যদি সিদ্ধান্ত পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়? এখন গুরুত্বপূর্ণ হবে নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে আবেদনগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, শুনানির সুযোগ বাড়ানো এবং নিষ্পত্তির নিয়মিত, পৃথক হিসাব প্রকাশ করা। ভোটাধিকারের প্রশ্নে সময়ও এখানে একটি বিবেচ্য।