ন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে ১৪ দিনের জেল হেফাজতে পাঠাল আদালত। শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে হলদিয়ার আদালতে হাজির করানো হয়। তাঁর আইনজীবী জামিনের আবেদন জানালেও পুলিশ বিরোধিতা করে। আদালতের নির্দেশে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভোট ৬ অক্টোবর। ফলে প্রচারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রার্থীর অনুপস্থিতি সামলাতে হবে কংগ্রেসকে। তবে দল জানিয়েছে, নির্বাচনী লড়াই থেকে পিছিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন নেই।

পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশের বক্তব্য, নন্দীগ্রাম ও খেজুরি থানার মামলায় চারটি বকেয়া জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে শুক্রবার চণ্ডীপুর থানা এলাকা থেকে মিলনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলাগুলি ২০০৭ সালের। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে খুন, খুনের চেষ্টা, হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ, প্রমাণ লোপাট, বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ এবং অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা।

পুলিশের দাবি, উনিশ বছর ধরে আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলছিলেন মিলন; অভিযোগপত্রেও তাঁকে পলাতক দেখানো হয়েছে। আগে একাধিকবার চেষ্টা করেও পরোয়ানা কার্যকর করা যায়নি। পুলিশের যুক্তি, নির্বাচনের আগে দীর্ঘদিনের বকেয়া জামিন অযোগ্য পরোয়ানা কার্যকর করার নির্দেশ থাকে নির্বাচন কমিশনের। সেই বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবেই এই গ্রেফতার।

মিলনের আইনজীবী অজিতেশ পাণ্ডের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, পুরনো মামলাগুলি প্রত্যাহার করা হয়েছিল; পরে সেগুলি ফের খোলার আবেদন হয় কলকাতা হাই কোর্টে। শুধু মিলন নন, অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও পরোয়ানা ছিল। কিন্তু মামলার সম্পূর্ণ বিবরণ তাঁদের হাতে নেই। পুলিশ অভিযোগপত্রও দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার জানিয়েছেন, প্রচারে মিলনকে দেখা না গেলেও দলের প্রতীক থাকবে। তাঁর হয়ে হাজার হাজার কর্মী মাঠে নামবেন। প্রার্থীর গ্রেফতারকে নির্বাচনী লড়াই থামিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে মানতে রাজি নয় কংগ্রেস।

গ্রেফতারের প্রতিবাদে শনিবার বিকেলে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় মিছিল করে কংগ্রেস। কলকাতার পার্ক সার্কাসেও প্রতিবাদ মিছিল হয়। আদালতে হাজিরার সময় মিলনও বিজেপিকে আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী হাওয়ায় ভয় পেয়েই তাঁকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে। উপনির্বাচনে মানুষ এর জবাব দেবেন বলেও দাবি করেন তিনি।

ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য বাড়িয়েছে শুক্রবারের ঘটনাক্রম। নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন থেকে নিজের গোষ্ঠীর প্রার্থী সরে দাঁড়ানোর পরে কংগ্রেসকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেফতার হন মিলন। তৃণমূলের বিবদমান দুই গোষ্ঠীর জন্য পৃথক নাম ও প্রতীক বরাদ্দের পর এই সমর্থনের সিদ্ধান্ত আসে। মমতা দাবি করেছেন, তাঁদের প্রার্থীকে ভয় দেখানো হয়েছিল। কংগ্রেস প্রার্থীর গ্রেফতার নিয়েও বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলেছে বিরোধী শিবির।

কংগ্রেসের দাবি, মিলন নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের পরিচিত মুখ এবং তাঁর বিরুদ্ধে সেই সময় থেকে একাধিক মামলা রয়েছে। দলের প্রশ্ন, মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরেই কেন তাঁকে গ্রেফতার করা হল? শুভঙ্করের অভিযোগ, পরাজয়ের আশঙ্কা থেকেই বিজেপি পুলিশকে ব্যবহার করছে। গ্রেফতারের প্রথম দিকে মিলনকে কোথায় রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছিল দল। পুলিশের প্রকাশিত বিবৃতিতে অবশ্য গ্রেফতারকে আদালতের পরোয়ানা কার্যকর করার পদক্ষেপ হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

কংগ্রেসের এক নেতা জানিয়েছেন, চণ্ডীপুরের একটি হোটেল থেকে মিলনকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তাঁকে গ্রেফতারে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দলের আর এক নেতা শুভাশিস ভট্টাচার্যকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের ভোটগণনা হবে ৯ অক্টোবর।

জামিন পেলে অবশ্য বদলাতে পারে পরিস্থিতি। নন্দীগ্রামে ভোটগ্রহণের তিন দিন আগে পর্যন্ত মিলনের হেফাজতের মেয়াদ নির্ধারিত হওয়ায় প্রচারের সমীকরণ বদলে গেল। মমতার সমর্থন কংগ্রেসের পক্ষে কতটা ভোট আনবে, তার পাশাপাশি এখন সামনে এসেছে প্রার্থীকে ছাড়াই প্রচার সংগঠিত করার পরীক্ষা। পুরনো মামলার আইনি প্রক্রিয়া এবং ভোটের মুখে পুলিশি পদক্ষেপের রাজনৈতিক বিতর্ক, দুই প্রশ্নই জড়িয়ে গেল এই উপনির্বাচনে।