চা ভাল ছিল, আতিথেয়তায় ত্রুটি ছিল না। কিন্তু লাদাখের দাবিদাওয়া একচুলও এগোল না—দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে বৈঠকের পরে এমনই প্রতিক্রিয়া পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের। বৃহস্পতিবার সাংবাদিক সম্মেলনে লেহ অ্যাপেক্স বডি এবং কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সের নেতারা জানিয়েছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে সরকার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব না দিলে ১৯ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর লাদাখে পদযাত্রা করবেন তাঁরা। বুধবারের আলোচনা নিয়ে তাঁদের অভিযোগ, সৌজন্য ছিল, সমাধানের নিশ্চয়তা ছিল না।

ওয়াংচুক বলেন, “আলোচনা সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল, চা ভাল ছিল, কিন্তু কিছুই এগোয়নি।” তাঁর বক্তব্য, ২২ মে কেন্দ্রের সঙ্গে নীতিগত বোঝাপড়ার পরে তাঁরা এবার একটি লিখিত খসড়া আশা করেছিলেন। নির্বাচিত নেতৃত্বের হাতে বাস্তব ক্ষমতা এবং নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালুর আগে বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বন্ধ রাখার নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন প্রতিনিধিরা। এই মৌলিক বিষয়গুলিতে সন্তোষজনক আশ্বাস মেলেনি বলে তাঁদের অভিযোগ।

এই অসন্তোষের পিছনে রয়েছে লাদাখের শাসনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ টানাপড়েন। ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীর ভেঙে পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার পরেও লাদাখ বিধানসভা পায়নি। পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা এবং সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের সুরক্ষার দাবি ক্রমে আন্দোলনের কেন্দ্রে এসেছে। জমি, চাকরি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। ফলে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠানের ঘোষণা দিয়ে এই বিতর্ক মেটানো কঠিন।

কেন্দ্রনিযুক্ত উপরাজ্যপালের মাধ্যমে অঞ্চলটির প্রশাসন চলে। লেহ ও কার্গিলে নির্বাচিত পাহাড়ি উন্নয়ন পরিষদ থাকলেও গোটা লাদাখের জন্য কোনও নির্বাচিত বিধানসভা নেই। এই ব্যবস্থায় স্থানীয় পরিষদের উপস্থিতি এবং অঞ্চলজুড়ে আইন তৈরির ক্ষমতা এক বিষয় নয়। আন্দোলনকারীদের দাবির তাৎপর্য বুঝতে এই পার্থক্য জরুরি, কারণ তাঁদের লক্ষ্য রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও কর্তৃত্ব।

এবার কেন্দ্রের তরফে সংবিধানে প্রস্তাবিত ৩৭১(কে) অনুচ্ছেদ যুক্ত করার কথা উঠেছে। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের বিবরণ অনুযায়ী, সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একটি অঞ্চলস্তরের শাসনসংস্থা গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জমি, সংস্কৃতি, ভাষা, বন, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা তাকে দেওয়ার কথা। পাশাপাশি প্রশাসন পরিচালনা, বাজেট, পরিকল্পনা এবং অর্থসংক্রান্ত ক্ষমতাও দাবি করেছেন লাদাখের প্রতিনিধিরা। তবে এই সংস্থার ক্ষমতার পূর্ণ পরিধি এখনও স্পষ্ট হয়নি।

বিশেষত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। ওয়াংচুকের বক্তব্য, নির্বাচিত সংস্থাকে আমলাতন্ত্রের উপরে কর্তৃত্ব দিতে হবে। আগের আলোচনার পরে এবারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার প্রশ্ন অক্টোবরে আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। প্রতিনিধিদের দাবি, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় অপরিবর্তনীয় রদবদল কিংবা জমি হস্তান্তরের মতো সিদ্ধান্ত নির্বাচিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আগে নেওয়া চলবে না। এমন পরিবর্তন হলে তাঁরা ফের আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন।

লাদাখ প্রশাসন অবশ্য আলোচনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। মুখ্যসচিব আশিস কুন্দ্রা বৃহস্পতিবার জানান, লাদাখের জন্য দেশের অন্য কোথাও নেই এমন একটি বিশেষ সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা তৈরির আলোচনা চলছে। সেটি পূর্ণ রাজ্য হবে না, প্রচলিত অর্থে বিধানসভাযুক্ত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলও হবে না। অন্য ধরনের একটি সংস্থার হাতে আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা থাকবে। তার নাম এবং বিস্তারিত কাঠামো এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

কুন্দ্রার ব্যাখ্যা, প্রস্তাবটি সাধারণ আইন করে কার্যকর করা যাবে না; সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। আগে মৌলিক নীতিগুলিতে বোঝাপড়া তৈরি হলে আইনি খসড়া প্রস্তুত করা সম্ভব। সেই উদ্দেশ্যেই প্রতিনিধিদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, জমি, কর্মসংস্থান, খনিজ সম্পদ, সংস্কৃতি ও পরিবেশ রক্ষার আকাঙ্ক্ষাকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে কেন্দ্র। আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব নেতৃত্বেরও রয়েছে।

কিন্তু কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সের সহসভাপতি সাজ্জাদ কার্গিলির অভিযোগ, তাঁরা পূর্ণাঙ্গ সরকারি খসড়া দেখতে গিয়েছিলেন, উল্টে শাসনকাঠামো নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর কটাক্ষ, তাঁরা নিট পরীক্ষা দিতে যাননি; লাদাখে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চাইতে গিয়েছিলেন। নেতৃত্বের বক্তব্য, সরকারপ্রধানের পদনাম, প্রতিনিধিসভার গঠন এবং আর্থিক ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বৈঠকের আগেই জানানো উচিত ছিল।

আলোচনার ফল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে ওয়াংচুক সমাজমাধ্যমে প্রয়াত অভিনেতা জসপাল ভাট্টির হাস্যরসাত্মক অনুষ্ঠান ‘ফ্লপ শো’-এর একটি দৃশ্যও ভাগ করেছেন। সেই দৃশ্যের ব্যঙ্গ হল, বৈঠকের একমাত্র সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত—পরের বৈঠকের দিন ঠিক করা। ওয়াংচুকের অভিযোগ, চার মাস আগের আলোচনার তুলনায় নতুন কিছু পাওয়া যায়নি। লাদাখের প্রতিনিধিরা আগেই গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানালেও সরকারের তরফে তার স্পষ্ট উত্তর আসেনি।

লেহ অ্যাপেক্স বডির সহসভাপতি চেরিং দোরজে লাকরুকও একই হতাশা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, একটি নির্দিষ্ট খসড়া পেলে তার ভিত্তিতে মত জানানো যেত। পরিবর্তে পুরনো বৈঠকের কার্যবিবরণীর কথাই ফিরে এসেছে। প্রতিনিধিরা নিজেদের অসন্তোষ লিখিতভাবে জানিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ফলে পরবর্তী বৈঠকের দিন ঘোষণাকে তাঁরা দাবিপূরণের নিশ্চয়তা হিসেবে নিতে পারছেন না।

আরও একটি অমীমাংসিত বিষয় ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরের আন্দোলন ও হিংসার ঘটনাকে ঘিরে দায়ের হওয়া মামলা। লাদাখের দুই সংগঠন সব মামলা একসঙ্গে প্রত্যাহার চেয়েছে। নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় উঠেছে। প্রতিনিধিদের বিবরণ অনুযায়ী, কেন্দ্র ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছে এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি বিবেচনার কথা জানিয়েছে। তবে পদক্ষেপের সময়সীমা ও পদ্ধতি নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ কাটেনি।

অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ফের আলোচনার কথা থাকলেও তার আগে লিখিত অগ্রগতি দেখতে চান আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট, মতপার্থক্য কেবল নতুন ব্যবস্থার নাম নিয়ে নয়; নির্বাচিত নেতৃত্ব কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, সেটাই আসল পরীক্ষা। কেন্দ্র বিশেষ সাংবিধানিক কাঠামো তৈরির জটিলতার কথা বলছে, লাদাখের নেতারা চাইছেন নির্দিষ্ট প্রস্তাব ও নিশ্চয়তা। সেই ব্যবধান না কমলে ১৯ সেপ্টেম্বরের পদযাত্রা ঘিরে ফের আন্দোলনের পথে ফিরতে পারে লাদাখ।